বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জুন মাসে দেশে ৩৩৩ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণ, হত্যা ও যৌন সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক।
জুনে নির্যাতনের শিকার ৩৩৩ নারী ও কন্যাশিশু: মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন
সদ্য বিদায়ী জুন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৩৩৩ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটি বলছে, ধর্ষণ, হত্যা, যৌন সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন, অপহরণ এবং সাইবার সহিংসতাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঘটনা গত মাসে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানুর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। সংগঠনটির লিগ্যাল এইড উপপরিষদ ১৫টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান প্রস্তুত করেছে।
ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার চিত্র উদ্বেগজনক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে ৭২ জন কন্যাশিশু ও ২৮ জন নারীসহ মোট ১০০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, যাদের মধ্যে ১২ জনই কন্যাশিশু।
এছাড়া ধর্ষণের পর সাতজন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানসিক ও সামাজিক চাপের কারণে একজন কন্যাশিশু আত্মহত্যা করেছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।
একই সময়ে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এর মধ্যে ৩১ জনই কন্যাশিশু।
যৌন নিপীড়ন ও সাইবার সহিংসতা
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ৪৩ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
এর মধ্যে ১১ জন যৌন নিপীড়নের, ২৯ জন উত্ত্যক্তকরণের এবং অন্তত তিনজন সাইবার সহিংসতার শিকার হন। সংগঠনটি বলছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে হয়রানির ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে।
হত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও আত্মহত্যা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে বিভিন্ন কারণে ৫৪ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৩৩ জনের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে।
একই সময়ে ১২ জন আত্মহত্যা করেছেন, যাদের মধ্যে চারজন কন্যাশিশু।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তত দুইজন আত্মহত্যায় প্ররোচনার শিকার হয়েছেন।
এছাড়া চারজন নারীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য নির্যাতন
সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার শিকার হয়েছেন পাঁচজন নারী। এর মধ্যে চারজন নিহত হয়েছেন।
পারিবারিক সহিংসতায় চারজন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত দুই কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের একজনের মৃত্যু হয়েছে।
জুন মাসে পাঁচজন কন্যাশিশু অপহরণের শিকার হয়েছে এবং আরও পাঁচজনকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে।
একই সময়ে দুই কন্যাশিশু মানবপাচারের শিকার হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণমাধ্যমভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, এই পরিসংখ্যান আদালতের নথি বা সরকারি অপরাধতথ্য নয়। বরং দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের
বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তথ্যগুলো সংগ্রহ ও সংকলন করা হয়েছে। ফলে বাস্তব ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন।
সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান
নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহজলভ্য আইনি ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
সংগঠনটির মতে, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং সমাজের সব স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
