বাংলাদেশের চলমান শাসনব্যবস্থা, ব্যাপক আর্থিক মন্দা, এফডিআই হ্রাস ও গভীর আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ড. আরিফ খানের এক বিশেষ পর্যবেক্ষণ।
অধ্যাপক ড. আরিফ খান: বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ, গভীর অর্থনৈতিক অবক্ষয় এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির জটিল চালচিত্র নিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। বিশিষ্ট গবেষক ও বিশ্লেষক প্রফেসর ডক্টর আরিফ খানের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণ অনুসারে, বিগত দুই বছর ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতা, বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা ধ্বংসের কারণে বর্তমান শাসনকাঠামো এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, জনসমর্থনহীন কোনো প্রশাসন যখন কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর ভর করে টিকে থাকতে চায়,
তখন দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সার্বভৌমত্ব কীভাবে হুমকির মুখে পড়ে—বাংলাদেশ এখন তারই এক বাস্তব পরীক্ষাগার।

৩০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষত ও মুখ থুবড়ে পড়া অর্থনীতি
প্রতিবেদনের শুরুতেই দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের এক অন্ধকার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বিগত দুই বছরে নিয়মনীতিহীন শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের মাধ্যমে দেশ থেকে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সম্পদ ও অর্থ পাচার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই চরম অর্থসংকটের কারণে রাষ্ট্র এখন বিদেশি তহবিল ও ঋণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
তবে দেশের ভেতরে চলমান মব ভায়োলেন্স বা উগ্র জনতার সহিংসতা, শিল্পকারখানায় উপর্যুপরি হামলা এবং প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদদে চলা চাঁদাবাজির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বিনিয়োগ হ্রাসের প্রধান কারণসমূহ:
- নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারীকরণ: দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান (যেমন- নগদ, সিটি গ্রুপ, বেক্সিমকো) এবং গভীর সমুদ্র বন্দর বা বিদেশি অর্থায়নে নির্মিত মেগা প্রকল্পগুলোর ওপর জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
- এফডিআই-এর বিপর্যয়: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) প্রায় ৭১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
সীমান্ত সংঘাতের নেপথ্যে ডিপ ষ্টেট ও সামরিক ম্যাপিং
ড. আরিফ খানের বিশ্লেষণে সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে।
তার মতে, বর্তমান অনির্বাচিত প্রশাসন একটি আন্তর্জাতিক ডিপ স্টেটের পুতুল হিসেবে কাজ করছে।
এই চক্রটি আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী দেশের সীমানায় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহের জন্য ‘করিডোর’ সুবিধা দেওয়ার মতো ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
এমনকি সামরিক বাহিনীকে তুষ্ট রাখতে ‘সামরিক ম্যাপিং’ এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর ঋণ থেকে প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে (ওভার-ইনভয়েসিং) দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
বিনিময়ে বাংলাদেশের কৌশলগত ভূমিকে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির দাবা খেলায় ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, যা সীমান্ত এলাকায় কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করছে।
আইএমএফ-এর কঠিন শর্ত ও উৎপাদনশীলতার অবক্ষয়
দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জনগণের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন এবং একপেশে মিডিয়া ট্রায়ালের ফলে উৎপাদনশীল খাত সম্পূর্ণ লাইনচ্যুত হয়েছে।
কৃষি ও পোশাক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিগুলো স্থবির হয়ে পড়ায় দেশ এখন আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।
এই ঘাটতি মেটাতে আইএমএফ থেকে যে জরুরি ঋণ নেওয়া হয়েছে, তার শর্ত হিসেবে কৃষি ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি তুলে নেওয়া হয়েছে।
ফলে সার, বীজ ও সেচ পাম্পের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য সুরক্ষায়।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে তৈরি পোশাক শিল্প ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও বড় নোট বাতিলের রহস্য
আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাংকিং সিন্ডিকেট এবং হুন্ডির মাধ্যমে আসা ভুয়ো রেমিট্যান্সের মিথ্যা প্রচারণাকে দায়ী করা হয়েছে।
প্রকৃত রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের ব্যাক-আপ ছাড়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেদারসে নতুন টাকা ছাপাচ্ছে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
রাজনৈতিক মদদপুষ্ট ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
এই লুটপাট ও অর্থ পাচারের ঘটনা ধামাচাপা দিতেই বর্তমান প্রশাসন ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাজার থেকে তুলে নেওয়া বা এর ব্যবহার সংকুচিত করার পরিকল্পনা করছে।
এর ফলে দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, যা দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখেছে, তা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে এবং জিডিপির আকার ছোট হয়ে আসবে।
চীনের ‘এমওইউ’ কূটনীতি ও ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সমীকরণ
বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব চীনের কাছ থেকে বড় অংকের আর্থিক সহায়তার আশায় বারবার বেইজিং সফর করলেও,
চীন কেবল দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষর করেছে, কোনো চূড়ান্ত চুক্তি করেনি।
বিগত সরকারের আমলে যেখানে বিলিয়ন ডলারের প্রকৃত বিনিয়োগ চুক্তি হতো, সেখানে বর্তমান সরকারের ঝুলিতে জুটেছে কেবল কিছু অকার্যকর আশ্বাস।
চীন-ভারত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল দিক:
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান ও কৌশলগত অবস্থান |
| চীন-ভারত বাণিজ্য | চীন ভারতে ১১৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে, বিপরীতে ভারত করে মাত্র ১৪ বিলিয়ন ডলার। চীন ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না। |
| বিনিয়োগের শর্ত | চীন সাধারণত নিজস্ব শ্রমিক ও সস্তা জীবনযাত্রার সুবিধাযুক্ত অঞ্চলেই কারখানা স্থানান্তর করে (যেমন আফ্রিকা), যা বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ। |
| সামরিক প্রস্তাব | লালমনিরহাট বা রংপুরের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরকে অস্থিতিশীল করার প্রস্তাব বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক স্বার্থের পরিপন্থী। |
মার্কিন দ্বিমুখী কৌশল ও আওয়ামী লীগের ভারসাম্য নীতি
পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অফশোরে বা দেশের বাইরে বড় শিল্প বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকছে।
তারা মূলত এআই এবং অটোমেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগী।
তবে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা ‘ডুয়েল ট্র্যাক’ বা দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করে।
প্রথমে তারা উগ্র ডানপন্থীদের ব্যবহার করে কোনো নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে,
এবং পরবর্তীতে সেখানে চরমপন্থার উত্থানকে অজুহাত বানিয়ে নিজেদের সামরিক ও লজিস্টিক ঘাঁটি গেড়ে বসে।
এর বিপরীতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে একটি সার্বভৌম, স্বায়ত্তশাসিত এবং জোট নিরপেক্ষ নীতি বজায় রেখেছিল।
যার ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক ছিল, কোনো সীমান্ত সংঘাত তৈরি হয়নি এবং দেশের অভ্যন্তরে অসংখ্য ইপিজেড নির্মাণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ প্রকৃত এফডিআই (FDI) আকর্ষণ করা সম্ভব হয়েছিল।
সামরিক অপচয় ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তনের সমীকরণ
প্রতিবেদনের শেষ অংশে বর্তমান প্রশাসনের সামরিক খাতের আরেকটি বড় দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউনুস আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের অকেজো ও অপ্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ড. আরিফ খান তার পর্যবেক্ষণের সমাপ্তি টেনেছেন এই বলে যে—উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, তারল্য সংকট, মেগা প্রজেক্টের নাট-বল্টু চুরির মতো সামাজিক অবক্ষয় এবং আন্তর্জাতিক মাস্টারদের দ্বারা এই পুতুল সরকারকে একসময় পরিত্যাগ করার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে এই ব্যবস্থার পতন আসন্ন।
তবে আশার আলো হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের ১৮০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও ২০ বিলিয়ন ডলারের অনুদান সুরক্ষিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী সরকারের কোনো বিকল্প নেই।
