২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি প্রক্রিয়া ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।
১৬ জুলাই ২০০৭: শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার, বাংলাদেশের রাজনীতির এক আলোচিত অধ্যায়
বিশেষ প্রতিবেদন | প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই একটি বহুল আলোচিত দিন। ওই দিন তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে তাঁর ঢাকার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে একটি চাঁদাবাজির মামলায় আদালতে হাজির করা হয় এবং পরে কারাগারে পাঠানো হয়। শেখ হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং তাঁর দল এই গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। অন্যদিকে তৎকালীন সরকার বলেছিল, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি শুধু একটি গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি অধ্যায়ে পরিণত হয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জরুরি অবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং পরবর্তী নির্বাচনী রাজনীতির নানা দিক।
১/১১–এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০০৬ সালের শেষ দিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ, সহিংসতা এবং নির্বাচন কমিশন নিয়ে মতবিরোধের জেরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক সংস্কার, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
১৬ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ
১৬ জুলাই ভোরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শেখ হাসিনার ধানমন্ডির বাসভবনে যান। পরে তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়।
তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একটি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে করা মামলায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। শেখ হাসিনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
গ্রেপ্তারের পর ঘটনাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
আওয়ামী লীগ ওই সময় একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করে। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এ সময় দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও আইনি পদক্ষেপও ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিফলন
ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।
তৎকালীন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ তখন জরুরি অবস্থার মধ্যে ছিল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলছিল। একই সঙ্গে এসব প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার অভিযোগ অস্বীকারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
কারাবাস ও পরবর্তী সময়
গ্রেপ্তারের পর শেখ হাসিনা সংসদ ভবন এলাকার একটি বিশেষ কারাগারে আটক ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয় এবং চিকিৎসার বিষয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়।
২০০৮ সালের জুনে তাঁকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়, যাতে তিনি বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে পারেন।
আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
[ইনলাইন ছবি: ২০০৭ সালে আদালত প্রাঙ্গণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির আর্কাইভ ছবি]
গ্রেপ্তারের পর শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া
গ্রেপ্তারের পর শেখ হাসিনাকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার শুনানি ধাপে ধাপে এগোতে থাকে। সে সময় দেশের বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলার কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক জনআলোচনা সৃষ্টি হয়।
আইনজীবীদের একাংশ তখন যুক্তি দেন, প্রতিটি মামলার নিষ্পত্তি আদালতের নিয়ম অনুযায়ী হওয়া উচিত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে তৎকালীন প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের আওতায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জরুরি অবস্থার বাস্তবতা
২০০৭ সালে বাংলাদেশ জরুরি অবস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল। রাজনৈতিক কর্মসূচি, সমাবেশ এবং জনসভা আয়োজনের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল।
এই সময়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়ে। অনেক নেতাকর্মী আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধার অভিযোগ ওঠে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই সময়কার পরিবেশ ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়, যেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সমান্তরালভাবে জাতীয় আলোচনায় স্থান পায়।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের পর আওয়ামী লীগ ঘটনাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে এবং আইনি ও রাজনৈতিক উভয় পর্যায়ে এর বিরোধিতা করে।
অন্যদিকে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দুর্নীতির অভিযোগে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নন।
দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলও বিভিন্ন সময়ে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে। কেউ আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানায়, আবার কেউ জরুরি অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
দেশজুড়ে জনআলোচনা
ঘটনার পর সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়।
একটি অংশ মনে করেছিল, দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্য অংশের মত ছিল, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
এই বিতর্ক শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী মহল এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিষয়টি আলোচনার জন্ম দেয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতিক্রিয়া
জরুরি অবস্থার সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজর কেড়েছিল।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষক সংস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
কিছু আন্তর্জাতিক মহল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দ্রুত পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্বারোপ করে। একই সঙ্গে আইনের শাসন ও বিচারিক স্বাধীনতার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
স্বাস্থ্যগত বিষয় ও চিকিৎসা
কারাবন্দি অবস্থায় শেখ হাসিনার স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন সময় সংবাদ প্রকাশিত হয়।
তাঁর আইনজীবী ও পরিবারের পক্ষ থেকে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এই বিষয়টিও সে সময় জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন
২০০৮ সালের দিকে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে।
জরুরি অবস্থার বিভিন্ন বিধিনিষেধ পর্যায়ক্রমে শিথিল করা হয় এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়।
এ সময় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো আবারও সাংগঠনিক কার্যক্রম সক্রিয় করতে থাকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণও তৈরি হতে থাকে।
নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা, নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরির বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে।
রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর নির্বাচন ঘিরে জনগণের আগ্রহ বাড়তে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সময়রেখাঃ
১১ জানুয়ারি ২০০৭: জরুরি অবস্থা জারি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ।
১৬ জুলাই ২০০৭: শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হন এবং আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়।
২০০৭–২০০৮: বিভিন্ন মামলার বিচারিক কার্যক্রম ও আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
২০০৮ সালের মাঝামাঝি: চিকিৎসার উদ্দেশ্যে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান।
ডিসেম্বর ২০০৮: জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০০৯: নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, ইতিহাসের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যতের শিক্ষা
নির্বাচনমুখী বাংলাদেশ ও রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন
২০০৮ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তনের দিকে এগোতে শুরু করে। জরুরি অবস্থার সময় আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ পর্যায়ক্রমে শিথিল হয় এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়।
নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক জরুরি অবস্থার পর গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী অগ্রগতি
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরবর্তী বছরগুলোতেও আদালতে চলতে থাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি মামলায় অভিযোগ খারিজ হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তন ঘটে। আদালতের বিভিন্ন রায় ও আদেশের ফলে মামলাগুলোর অবস্থান সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো রাজনৈতিকভাবে আলোচিত মামলার ক্ষেত্রেই আদালতের স্বাধীনতা, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা অনেক ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষক ২০০৭-০৮ সময়কালকে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তাদের মতে, ওই সময় দেশের প্রশাসনিক, বিচারিক এবং রাজনৈতিক কাঠামো একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
কেউ কেউ এই সময়কে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের একটি পর্যায় হিসেবে দেখেছেন, আবার অন্যরা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সাময়িক বিরতির সময় হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
এই ভিন্নমতগুলোই প্রমাণ করে যে ঘটনাটির মূল্যায়ন এখনো গবেষণা ও আলোচনার বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনা বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—
- সংকটকালেও রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
- রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার।
- মতভেদ থাকলেও রাজনৈতিক সংলাপ দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রশ্ন
২০০৭ সালের ঘটনাগুলোকে ঘিরে একটি বড় আলোচনার বিষয় ছিল—গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভারসাম্য।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনআস্থা বজায় রাখা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার অন্যতম শর্ত।
নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের শিক্ষা
আজকের অনেক তরুণ ভোটার ও শিক্ষার্থীর জন্ম বা শৈশব কেটেছে ২০০৭ সালের সেই ঘটনার পরে।
তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এই অধ্যায়টি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়;
বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতীতের ঘটনাগুলোকে আবেগ নয়, তথ্য ও গবেষণার আলোকে মূল্যায়ন করলে ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক শিক্ষা গ্রহণ করা সহজ হয়।
ইতিহাসের আলোচনায় ১৬ জুলাই
প্রতি বছর ১৬ জুলাই এলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গবেষক, সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ এই ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে স্মরণ করে।
কেউ এটিকে রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখেন, আবার কেউ বিচারিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার আলোচনার অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মত হলো, ঘটনাটিকে বোঝার জন্য তৎকালীন রাজনৈতিক, সাংবিধানিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০০৭ সালের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বহুল আলোচিত অধ্যায়। এটি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়;
বরং সেই সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা, জরুরি অবস্থা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ঘটনাটিকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গবেষক ও বিশ্লেষকের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে ২০০৭-০৮ সময়কাল একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।
ইতিহাসের এমন ঘটনাগুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক গবেষণা, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং বহুমাত্রিক বিশ্লেষণই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
ভবিষ্যতের জন্যও এই অভিজ্ঞতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সংলাপের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
