দিনাজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী সতীশ চন্দ্র রায় পরলোকগমন করেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী সতীশ চন্দ্র রায়ের জীবনাবসান ও রাজনৈতিক জীবন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নক্ষত্রপতনের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী সতীশ চন্দ্র রায়। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে তিনি নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁর এই প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রবীণ এই নেতার বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রজন্মের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ ও পরলোকগমনের বিবরণ
দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলপুর ইউনিয়নের মোস্তফাবাদ গ্রাম। এই গ্রামেরই নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল পঁচানব্বই বছর। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
মঙ্গলবার রাত প্রায় নয়টা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিটে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর এই চিরবিদায়ের সংবাদ দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে শোকের আবহ তৈরি হয়। মৃত্যুর সময় তিনি স্ত্রী, তিন পুত্র, দুই কন্যা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন। পরদিন দুপুরে তাঁর পারিবারিক শ্মশানে যথাযথ মর্যাদায় শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব
সতীশ চন্দ্র রায় কেবল একজন সাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক। দেশের ক্রান্তিলগ্নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে জাতিকে মুক্ত করতে নিজের মেধা ও শ্রম উৎসর্গ করেছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পদে আসীন ছিলেন।
দলীয় ফোরামে তিনি প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই জননেতা সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সততা দলীয় সীমানা ছাড়িয়ে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল।
সংসদ সদস্য হিসেবে দীর্ঘ পথচলা ও জনসেবা
জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সতীশ চন্দ্র রায় একাধিকবার জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। তৎকালীন দিনাজপুর-৭ এবং পরবর্তী সময়ে বিন্যস্ত দিনাজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সংস্কারে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর সততা ও কর্মতৎপরতা স্থানীয় জনগণের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।
এলাকার সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে তিনি সবসময় ছায়ার মতো পাশে থাকার চেষ্টা করতেন।
তাঁর এই জনমুখী নেতৃত্ব স্থানীয় রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতা তৈরি করেছিল।
মন্ত্রিসভায় সফল দায়িত্ব পালন ও মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন
জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সতীশ চন্দ্র রায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
পরবর্তীতে তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।
শিক্ষা ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে তিনি নানা সময় যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রেখে তিনি নিজ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করায় ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন।
তাঁর আমলেই দেশের প্রাথমিক শিক্ষাবিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল।
শোক প্রকাশ ও শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন
প্রবীণ এই নেতার প্রয়াণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শোকবার্তা আসতে শুরু করে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাঁর মরদেহের শেষ দর্শনের জন্য ভিড় জমান।
বুধবার দুপুর বারোটার দিকে বিরল উপজেলার মোস্তফাবাদ এলাকায় তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
পারিবারিক শ্মশানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর নশ্বর দেহ পঞ্চভূত সংলীন হয়। এই অন্তিম যাত্রায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি
ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। দেশের এই বরেণ্য নেতার প্রয়াণে সৃষ্ট শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
সতীশ চন্দ্র রায়ের জীবন ও কর্ম আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীন
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর আদর্শ ও রাজনৈতিক সততা আগামী দিনের রাজনীতিবিদদের সঠিক পথ দেখাবে।
আমরা মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।
