বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষারের প্রশ্নে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের জবাবদিহির সংকট। ‘রাষ্ট্র মেরামতের নামে চা-নাশতা’—এই বাক্যই এখন জনরোষের প্রতীক।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র যখন ‘মেরামতের’ নাম করে অগণিত কমিটি, পরামর্শক ও ভ্রমণ ব্যয়ের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে, তখন এক সাধারণ অথচ গভীর প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক আব্দুন নূর তুষার— “কত টাকা খরচ করেছেন রাষ্ট্র মেরামতের নামে চা-নাশতা খেয়ে?” তুষারের এই প্রশ্ন শুধুই একটি ব্যঙ্গাত্মক বাক্য নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা, দায়হীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির নগ্ন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
তুষার তার পোস্টে মেট্রো রেলের রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতির কথা টেনে বলেছেন—“মেট্রো রেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে গেছে।”
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশের অধিকাংশ স্থাপনাই একই দুরবস্থার শিকার।
একদিকে কোটি কোটি টাকার ‘উদ্বোধনী উৎসব’, অন্যদিকে নিরাপত্তার মানে শূন্য।
রাস্তায় খোলা ম্যানহোল, আগুনে পুড়তে থাকা শপিংমল, কিংবা স্টেডিয়ামে জরুরি নির্গমনপথের অভাব—
সব মিলিয়ে রাষ্ট্র যেন বারবার প্রমাণ করছে, মানুষের জীবনের চেয়ে বিলাসী ব্যয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তুষারের তীব্র প্রশ্ন—
“মৃত্যুর বিনিময়ে কিছু টাকা দিলেই হয়ে গেল? এই মানুষটি না থাকলে কি শুধু তার পরিবারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে?”
এই প্রশ্নে ফুটে ওঠে মানবজীবনের প্রতি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা।
দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক লাখ টাকার চেক দিয়ে দায়মুক্তির সংস্কৃতি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
যে রাষ্ট্র প্রতিদিন ‘মেরামত’ আর ‘সংস্কার’-এর নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে, সেই রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের প্রাণের মূল্য এতই তুচ্ছ কেন?
“রাষ্ট্র মেরামতের” অর্থনীতি: আলী রীয়াজের ব্যয়ের প্রশ্নে বিতর্ক
তুষার তার বক্তব্যে আরও ইঙ্গিত করেছেন—
“আলী রীয়াজের পেছনে মাসে খরচ কত? রাষ্ট্র মেরামতের সেই টাকা দিয়ে রেলের রক্ষণাবেক্ষণ করলে হয়তো উপকার হতো।”
এই মন্তব্যটি কেবল ব্যক্তিগত সমালোচনা নয়, বরং পুরো ‘রাষ্ট্র মেরামত কমিশন’ বা তথাকথিত ‘সংস্কার প্রকল্প’-এর অস্বচ্ছ ব্যয় কাঠামোর প্রতি আঙ্গুল তোলে।
যেখানে লন্ডন সফরে প্রতিরাতে ৯ লাখ টাকার বিছানাভাড়া দেওয়া যায়, সেখানে দুর্ঘটনায় নিহত নাগরিকের পরিবারকে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা দিতে দ্বিধা নেই—
এটাই বাস্তবতার নির্মম বৈপরীত্য।
একটি রাষ্ট্র যখন জনগণের জীবনরক্ষার ন্যূনতম দায়িত্বও পালনে ব্যর্থ হয়, তখন সেটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি নৈতিক দেউলিয়াত্ব।
‘রাষ্ট্র মেরামতের নামে চা-নাশতা’ এখন শুধু তুষারের ভাষা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মুখে উচ্চারিত এক তিক্ত বাস্তবতা।
তুষারের পোস্ট জনমনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, তা আসলে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ—
রাষ্ট্রীয় দায়হীনতার বিরুদ্ধে জনগণের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
তুষারের এই প্রশ্ন হয়তো অনেকের কাছে ব্যঙ্গাত্মক শোনাতে পারে, কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের ভিত্তি।
যে রাষ্ট্র নিজের ব্যয়ের হিসাব দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে—এই প্রত্যাশাই অবাস্তব।
রাষ্ট্র মেরামতের নামে যদি আবারও “চা-নাশতার” বিল বাড়ে, তবে জনগণও একদিন নিজের রাষ্ট্র মেরামতের উদ্যোগ নেবে—
হয়তো প্রশ্নের ভাষায়, হয়তো ভোটের মাধ্যমে, অথবা নীরব প্রতিরোধে।
