ভারতের চাল সরাসরি না এনে দুবাই হয়ে আমদানি করছে বাংলাদেশ। খাদ্য নিরাপত্তার যুক্তির আড়ালে কি আছে নতুন বাণিজ্য ঘাটতি ও মধ্যস্বত্বভোগীর স্বার্থ?
চাল উৎপাদন করে না এমন এক মরুভূমির দেশ দুবাই থেকে বাংলাদেশ চাল কিনছে—এমন খবর অনেকেরই কপালে ভাঁজ ফেলেছে। খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন, এই চালের মূল উৎস ভারত, তবে সরবরাহকারীর অফিস দুবাইয়ে। অর্থাৎ, ভারতীয় চাল ঘুরে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের এক বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে—যেখানে মূলত পুনঃরপ্তানিই ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ ২২ অক্টোবর যে প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে,
তাতে দুবাইয়ের ক্রিডেন্টওয়ান এফজেডসিও নামের কোম্পানি থেকে ৫০ হাজার টন নন-বাসমতি সেদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রতি টন ৩৫৫.৯৯ ডলার দরে এর মোট ব্যয় হবে ২১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
একই সভায় মিয়ানমার থেকেও ৫০ হাজার টন আতপ চাল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।
খাদ্য অধিদপ্তর বলছে, দেশের গুদামে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল মজুত আছে, যা স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।
গত বছরের তুলনায় এবার মজুদ বেড়েছে ৩ লাখ টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার পর্যন্ত বলেছেন, “চাহিদার চেয়ে এক কোটি মেট্রিক টন খাদ্য বেশি উৎপাদন হয়েছে।”
তবু কেন চাল আমদানি করতে হচ্ছে?
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, এটি খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি—যদি আমন মৌসুমে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ ঘটে, তাহলে যেন দ্রুত মজুদ বাড়ানো যায়।
তবে অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলছেন, “দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কেন অতিরিক্ত আমদানি করা হবে, তাও মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে?”
একজন সরকারি কর্মকর্তা যুক্তি দিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দুবাই থেকে চাল আনা হচ্ছে।
তাঁর মতে, দুবাইয়ে বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান; তাই সেখান থেকে চাল আমদানি করলে সেই আয়ের একটি অংশ ব্যবহার করে “দায় শোধ” করা সহজ হয়।
কিন্তু অর্থনীতিবিদরা এই ব্যাখ্যাকে “অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল” বলছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন,
“যখন সোর্স দেশ থেকেই কম দামে পাওয়া যায়, তখন ঘুরপথে এনে খরচ বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। এখানে নিশ্চয়ই কিছু ‘ইন্টারেস্ট গ্রুপ’ সক্রিয়।”
দুবাই: মধ্যস্বত্বভোগীর হাব
দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে খাদ্য পুনঃরপ্তানির অন্যতম হাব।
ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা চাল তারা আবার বিভিন্ন দেশে বিক্রি করে।
ক্রিডেন্টওয়ান এফজেডসিও এই পুনঃরপ্তানি শৃঙ্খলের অংশ, যারা মূলত ভারতীয় চাল কিনে তা “দুবাই উৎস” হিসেবে অন্য দেশে বিক্রি করে।
বাংলাদেশ এই রুটে কেনার ফলে দুইবার পরিবহন ব্যয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীর কমিশন উভয়ই দিতে হচ্ছে, যা জনগণের অর্থে অপচয় বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা কেবল সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে—নীতিনির্ধারণ করে না।
অর্থাৎ এই সিদ্ধান্ত এসেছে ক্যাবিনেট পর্যায় থেকে।
কিন্তু সেখানে কারা এই প্রস্তাব দিয়েছে, কোন পরামর্শে এবং কেন সরাসরি ভারত থেকে না এনে ঘুরপথে আনা হলো—সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শাহরিয়ার খান যেমন বললেন,
“ভারতের চাল দুবাই ঘুরে বাংলাদেশে আসার পেছনে কার লাভ হচ্ছে—এটা জানাটা এখন সবচেয়ে জরুরি। না হলে দুর্নীতির গন্ধ থেকেই যাবে।”
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে প্রায় ৯ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে।
এবার যদিও আমদানির পরিমাণ তুলনামূলক কম, তবু এই ঘুরপথে আমদানি প্রক্রিয়া প্রশাসনিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে,
“চাল আমদানির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার” সরকারি যুক্তি যথার্থ হলেও, এই ধরনের পরোক্ষ ও ব্যয়বহুল ক্রয়পদ্ধতি জনগণের অর্থের সাশ্রয়ের বিপরীতে কাজ করছে।
যখন দেশের মাঠে আউশ উঠেছে, আমন মৌসুমও আসন্ন, এবং সরকারি গুদামে মজুদও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি—
তখন দুবাই হয়ে ভারতীয় চাল আনার সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
যদি সত্যিই বাণিজ্য ঘাটতি কমানো উদ্দেশ্য হয়, তবে সেটি সরাসরি বৈদেশিক বাণিজ্য নীতির মাধ্যমে করা সম্ভব—
জনগণের খাদ্য মজুদের নামে ঘুরপথে চাল কিনে নয়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা—
দুটি বিষয়ই একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করছে।
