প্রাক্তন সিআইএ কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্বুদ্ধিতা দেশটিকে বারবার বিপর্যয়ে ফেলেছে; এটি প্রাতিষ্ঠানিক নার্সিসিজমের লক্ষণ।
ডেস্ক রিপোর্ট | ঢাকা | নভেম্বর ২০২৫
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) প্রাক্তন কর্মকর্তা ও মধ্যপ্রাচ্য নীতি বিশ্লেষক ব্রুস রিডেল বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক “নার্সিসিজম” বা আত্মমুগ্ধতায় আক্রান্ত, যা তাদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তিনি ২০১১ সালে এক মন্তব্যে বলেন,
“পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তারা চরম নির্বোধ। তাদের নির্বুদ্ধিতার কারণেই দেশটি একের পর এক বিপর্যয়ে পড়ছে। তারা মনে করে তারা সবাইকে—including আমেরিকানদেরকেও—ছলচাতুরিতে হারাতে পারবে।”
রিডেলের মতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বারবার কৌশলগত ভুল—বিশেষ করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের পরাজয়—এই নার্সিসিস্টিক মানসিক বিকারেরই প্রতিফলন।
‘নির্বুদ্ধিতাকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বুদ্ধি ভাবা’ – প্রাতিষ্ঠানিক রোগ
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই মানসিকতা একক কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং একটি “কালেকটিভ মানসিক রোগ”।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এটি তৈরি করে এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে “ভাবমূর্তি রক্ষা” এবং “ঈশ্বরপ্রদত্ত শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি” সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেয়ে বড় হয়ে যায়।
রিডেল বলেন,
“যখন কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট মনে করে, তখন সমালোচনার জায়গা থাকে না। এর ফলেই অন্ধ সিদ্ধান্ত, ভুল যুদ্ধ এবং আত্মবিনাশ।”
এমন মানসিকতা কেবল পাকিস্তানেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আরও কিছু দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
যুদ্ধ থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ইতিহাস
১৯৪৭ সালের পর থেকে পাকিস্তান তিনটি বড় যুদ্ধে জড়িয়েছে—১৯৪৮, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে ভারতের সঙ্গে, এবং প্রতিবারই পরাজিত হয়েছে।
তবুও তাদের সামরিক নেতৃত্ব নিজেদের ‘কৌশলগত প্রতিভাবান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
ব্রুস রিডেলের ভাষায়,
“যে সেনাবাহিনী প্রতিটি যুদ্ধে হেরে যায়, অথচ নিজেদের বুদ্ধিমান ভাবতে থাকে, তার মানে তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে অক্ষম।”
এই মানসিক গঠনই পাকিস্তানে গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে, সেনাশাসনকে দীর্ঘায়িত করেছে এবং বেসামরিক নেতৃত্বকে বারবার অস্থিতিশীল করেছে।
বাংলাদেশেও ‘প্রাতিষ্ঠানিক আত্মমুগ্ধতা’র ছোঁয়া
রিডেল সতর্ক করেন,
পাকিস্তানের এই সামরিক মানসিকতা ধীরে ধীরে বাংলাদেশেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করছে, যেখানে কিছু শক্তি নিজেদের “জাতির ত্রাতা” হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।
বিশ্লেষকরা বলেন, এই ধরনের “অতিবুদ্ধিমান ভাবা” মনোভাব সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেয় এবং সমালোচনাকে “রাষ্ট্রবিরোধী” হিসেবে চিহ্নিত করে।
মনোবিজ্ঞানীরা কী বলছেন
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (NPD) কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও বিকশিত হতে পারে।
যখন কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে, তখন তা ‘ইনস্টিটিউশনাল নার্সিসিজম’ নামে পরিচিত হয়।
এমন প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা বিশ্বাস করেন তারা “বিশেষভাবে নির্বাচিত”, তাদের সিদ্ধান্ত সবসময় সঠিক—যা বাস্তবে অন্ধ আনুগত্য তৈরি করে এবং সমষ্টিগত আত্মবিনাশ ডেকে আনে।
উপসংহার
ব্রুস রিডেলের পর্যবেক্ষণ আজও প্রাসঙ্গিক। পাকিস্তানের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা—সব কিছুর মূলে রয়েছে সেই দীর্ঘস্থায়ী আত্মমুগ্ধ মানসিক কাঠামো।
তিনি সতর্ক করে বলেন,
“যে জাতি নিজেদের ভুল স্বীকার করতে শেখে না, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি থেকে কখনো মুক্ত হতে পারে না।”
রেফারেন্স:
- Riedel, Bruce. Deadly Embrace: Pakistan, America, and the Future of the Global Jihad. Brookings Institution Press, 2011.
- Brookings Institution Analysis (2011): https://www.brookings.edu
- Dawn News, Pakistan (Archive Report, 2012)
