যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাংলাদেশ ক্রমেই চীনের সামরিক অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকছে — বেইজিং-এর প্রতিরক্ষা পৃষ্ঠপোষকতা ও ‘থিঙ্ক টোয়াইস অ্যাক্ট’ নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ
ঢাকা-ওয়াশিংটন-বেইজিং তিনকোণীয় ভূরাজনৈতিক খেলা নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে Bangladesh-র প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে China-র ক্রমবর্ধমান প্রবেশ এবং সেই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-এর উদ্বেগের সূচনা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, বাংলাদেশ এখন শুধু বন্ধুত্বজনক অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ নয় — তা সামরিক ময়দানে চীনের সঙ্গে ঘন-সম্পর্ক গড়ার দিকে ধাপচ্ছে, যা ওয়াশিংটনের জন্য নিরাপত্তা ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের ড্রাইভিং ফ্যাক্টর
যুক্তরাষ্ট্রের আশা-নিরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে কয়েকটি স্পষ্ট বিষয়।
প্রথমত, চীনের সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি ও এর মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার নীতি—যার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন নতুন আইন, Think Twice Act 2025-এর প্রস্তাব দিচ্ছে। এই আইন অনুসারে, কোনো দেশ যদি চীনের কাছ থেকে অস্ত্র ক্রয় বা ব্যবহার করে, তাহলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ঢাকায় নিযুক্ত হবার পথে থাকা রাষ্ট্রদূত Brent Christensen-র মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, চীনের সামরিক সম্পৃক্ততা শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলেও দ্রুত বাড়ছে — যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য উদ্বিগ্ন বিষয়।
তৃতীয়ত, ভারতের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায়, দক্ষিণ এশীয় ভূ‐নিরাপত্তা স্থিতি বদলায়নি বললেও নতুন সংকেত দিচ্ছে যে বাংলাদেশ একমাত্র ভারতের উপর নির্ভর না হয়ে, বহু অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক: চীন-ভিত্তিক ঘুর্ণন
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে বেশ কয়েকটি চীন-উৎপাদিত উপাদান ও সামরিক সামগ্রী গ্রহণ করেছে এবং চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের দিকেও আগ্রহ দেখাচ্ছে। এখানে রয়েছে দুটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত:
- প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সংশ্লিষ্ট অংশীদারিত্ব এবং উপকাঠামোয় প্রবেশ (যেমন বেস, বিমানঘাঁটি, রডার বা সিস্টেম) — যা ভারতের সিলিগুড়ি করিডোর বা “চিকেনস নেক”ের কাছাকাছি অবস্থান করেছে বলে পরিসংখ্যান ও সংবাদ প্রকাশ করেছে। The Economic Times
- ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশ বাংলাদেশের স্বার্থে বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্ব গড়ার চেষ্টায় রয়েছে, যার মধ্যে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কি ভাবছে?
ওয়াশিংটনের প্রয়াস এখন স্পষ্ট: বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব যাতে শুধুই একটি দেশের কাছেই না পড়ে,
বরং বিকল্প পথ ও যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সাপ্লায়ার ও অংশীদারিত্বও সক্রিয় করতে হবে।
রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলছেন, তিনি ঢাকায় এসে বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে “স্পষ্ট, পারস্পরিক লাভজনক” প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবেন।
সেই সঙ্গে তিনি চলে যাচ্ছেন চীনের প্রভাব ও ঝুঁকিগুলো তুলে ধরার উদ্দেশ্যে।
সম্ভাব্য প্রভাব এবং বিপদ
এই ধরনের সমঝোতা ও অংশীদারিত্বে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টিকোণ রয়েছে।
- প্রথমত, যদি বাংলাদেশ মূলত চীন-ভিত্তিক সামরিক অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, সরবরাহ‐চেইন এবং প্রযুক্তি-অ্যাক্সেস ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
- দ্বিতীয়ত, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কাছে প্রতিরক্ষা স্থিতি বদলে যেতে পারে, যা ভারতের কর্তৃপক্ষ ও প্রতিরক্ষা পরিসরে উদ্বেগ বাড়াবে।
- তৃতীয়ত, এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে — যেখানে একক নির্ভরতা না রেখে একাধিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হচ্ছে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ
ঢাকার পক্ষে বিষয়টি বলা যেতে পারে কৌশলগত স্বনির্ভরতার এক অংশ।
প্রধানমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একদিকে বলছেন, বাংলাদেশ “নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতিতে অটল” এবং “বহু অংশীদারিত্বই ভবিষ্যতের পথ”।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের চোখে দেখা যাচ্ছে—তথ্য ও পরিস্থিতি অনুযায়ী চীনের সামরিক অংশীদারিত্ব দ্রুত বাড়ছে, যার দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য
বাংলাদেশের সামরিক অংশীদারিত্বের মানচিত্র এখন শুধু পারিবারিক বা ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা রূপরেখার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠছে। চীনের প্রতি বাংলাদেশের সম্পর্ক যত দ্রুত গভীর হচ্ছে, ততো বেশি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের কৌশল স্পষ্ট: একক নির্ভরতা না রেখে বহুপাক্ষিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।
তবে এই সিদ্ধান্তে দেশের সার্বভৌম স্বার্থ, স্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং অংশীদারিত্বের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
