ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বক্তব্যে সংযত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ফার্স্টপোস্টে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক বার্তা দেন।
ঢাকা | নভেম্বর ২০২৫:
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বক্তব্যের ক্ষেত্রে সংযত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি বলেন ” ‘ইউনুসের কথার দিকে নজর দেওয়া উচিত’: ভারত বাংলাদেশের সাথে ঝগড়া চায় না।” ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট এবং নেটওয়ার্ক১৮ গ্রুপ–এর প্রধান সম্পাদক রাহুল যোশীর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,
“নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক চায় না। অধ্যাপক ইউনূসের উচিত তিনি কী বলছেন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।”
রাজনাথের এই বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে — ভারত ইউনূস সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ভারতের বার্তা: বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই মূল লক্ষ্য
রাজনাথ সিং সাক্ষাৎকারে আরও বলেন,
“ভারত যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম। যদিও আমাদের লক্ষ্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।”
এই মন্তব্যে ভারত স্পষ্ট করেছে যে, তারা সামরিক উত্তেজনা নয় বরং কূটনৈতিক সমাধান চায়। তবে ইউনূস সরকারের অবস্থান ও তার সাম্প্রতিক মন্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
‘আর্ট অব ট্রায়াম্ফ’ উপহার ও বিতর্ক
ফার্স্টপোস্ট জানায়, ড. ইউনূস সম্প্রতি সফররত পাঁচ সদস্যের তুর্কি সংসদীয় প্রতিনিধিদলকে “Art of Triumph” নামে একটি বই উপহার দেন।
এই বইয়ে আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত শিক্ষার্থী আন্দোলনের সময় আঁকা গ্রাফিতির সংগ্রহ তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮ দাবি করেছে, বইটির ভেতরে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’–এর ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ভারতের আসামসহ উত্তর–পূর্বাঞ্চলকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ তত্ত্বে ভারতীয় উদ্বেগ
নিউজ১৮–এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানায়, বইটিতে কথিত “যুদ্ধ পরিকল্পনা” এবং “বিজয়ের পর প্রশাসনিক কাঠামো” সম্পর্কিত বিষয়ও রয়েছে।
এতে নাকি আসামকে ঢাকার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি “উৎপাদনশীল অঞ্চল” হিসেবে দেখানো হয়েছে।
যদিও এ বিষয়ে ড. ইউনূসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে ভারতীয় কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,
এই বিতর্ক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নীতি-অভিমুখ নিয়ে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম থেকেই ভারতবিরোধী অবস্থানের অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়ে।
রাজনাথ সিংয়ের এই সর্বশেষ মন্তব্য মূলত নয়াদিল্লির কৌশলগত উদ্বেগের প্রকাশ, যা ভারতের পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা ইস্যুকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) অরুণ সাহা ফার্স্টপোস্টকে বলেন—
“বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ইউনূস সরকারের কিছু বক্তব্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে।”
বিশ্লেষণ
ভারতের এই কূটনৈতিক বার্তা শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা নয়; এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক বার্তা।
ভারত চায় না বাংলাদেশ তার ঐতিহ্যবাহী কৌশলগত বন্ধুত্ব থেকে সরে গিয়ে কোনো ইসলামপন্থী বা বিদেশি প্রভাবের দিকে ঝুঁকে পড়ুক।
ড. ইউনূসের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিশেষত তুর্কি ও পাকিস্তানি সামরিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, দিল্লির দৃষ্টিতে “অস্বাভাবিকভাবে সংবেদনশীল” বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনাথ সিংয়ের “সংযত থাকার আহ্বান” তাই কেবল রাজনৈতিক পরামর্শ নয়, বরং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক রক্ষার এক কূটনৈতিক সতর্কবার্তা — যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারসংক্ষেপে:
রাজনাথ সিংয়ের এই বার্তা বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি ভারতের আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেয়।দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য ইউনূস সরকারের বক্তব্য ও অবস্থান এখন আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায়।
🔗 রেফারেন্স ও সূত্র
- https://www.firstpost.com/india/rajnasth-singh-exclusive-interview-defence-minister-muhammad-yunus-india-bangladesh-dhaka-13948630.htmlFirstpost – Exclusive Interview: Rajnath Singh on South Asia
- Network18 – Rahul Joshi’s Interview Series
- News18 – Yunus’s “Art of Triumph” and Greater Bangladesh Allegations
