ThePrint-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ড. ইউনূসের প্রশাসনিক অদক্ষতা ও নীতিগত অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি গভীর ঝুঁকিতে পড়ছে।
ঢাকা | নভেম্বর ২০২৫:
ভারতের প্রভাবশালী অনলাইন পত্রিকা ThePrint সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলেছে — “Asia’s Weakest Link”, অর্থাৎ এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক সংযোগে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য— ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঠিক করতে গিয়ে পুরো অর্থনীতিকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ব্যাংকিং খাত: ভাঙা বিশ্বাস ও স্থবিরতার ফাঁদ
ThePrint–এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ ভয়াবহ আস্থাহীনতার মধ্যে পড়েছে।
ড. ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর একাধিক ব্যাংক পুনর্গঠন উদ্যোগ নেন—যেমন ঋণখেলাপিদের তালিকা হালনাগাদ, বেসরকারি ব্যাংকে বিদেশি শেয়ার বিক্রয়ের অনুমোদন, এবং নতুন নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন।
কিন্তু, এসব পদক্ষেপ কার্যকর করার আগে কোনো নীতিগত স্বচ্ছতা বা অর্থনৈতিক বাস্তবতা যাচাই করা হয়নি।
ফলে দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে;
👉 বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ডলার তুলে নিতে শুরু করে,
👉 রিজার্ভ নেমে যায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের নিচে,
👉 এবং আন্তঃব্যাংক লেনদেন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মো. আবুল কাসেম ThePrint–কে বলেন,
“ইউনূস সরকার এমনভাবে সংস্কার চাপিয়ে দিয়েছে যেন অর্থনীতি একদিনে বদলে যাবে। অথচ অর্থনীতি কোনো একাডেমিক এক্সপেরিমেন্ট নয়।”
‘সামাজিক ব্যবসা’ তত্ত্বের ব্যর্থ প্রয়োগ
ড. ইউনূসের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল “সোশ্যাল বিজনেস” — অর্থাৎ লাভ নয়, সামাজিক কল্যাণই হবে ব্যবসার লক্ষ্য।
কিন্তু ThePrint–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই তত্ত্ব সরকারি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছেন।
উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—
🔹 কৃষিঋণ ও ক্ষুদ্রঋণের মধ্যে অদ্ভুত মিশ্রণ তৈরি,
🔹 গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল অনুসারে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণনীতিতে হস্তক্ষেপ,
🔹 এবং সরকারি ভর্তুকিকে “সামাজিক বিনিয়োগ” হিসেবে দেখানো।
ফলাফল:
👉 ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৪৩%–এ পৌঁছেছে,
👉 সরকার রাজস্ব ঘাটতি পূরণে ছাপাখানার টাকা নির্ভরতা বাড়িয়েছে,
👉 এবং মুদ্রাস্ফীতি ১৪% ছাড়িয়েছে—যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
প্রশাসনিক অদক্ষতা ও নীতি–দ্বন্দ্ব
রিপোর্টটি আরও বলছে, ড. ইউনূসের প্রশাসনিক টিম মূলত একাডেমিক ও এনজিও–পটভূমি থেকে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত।
তাদের মধ্যে কেউই রাষ্ট্রীয় বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রানীতি, বা নিরাপত্তা অর্থনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ নন।
ThePrint মন্তব্য করেছে—
“Yunus is walking a tightrope — he wants reforms without politics, governance without legitimacy.”
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. আনিসুল হক বলেন,
“একটা রাষ্ট্র চালাতে শুধু ‘মাইক্রোক্রেডিট দর্শন’ যথেষ্ট নয়। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো সংস্কার টেকে না।”
আঞ্চলিক অর্থনীতি ও ভারতের উদ্বেগ
ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ThePrint–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নয়াদিল্লি আশঙ্কা করছে—বাংলাদেশের ব্যাংক ও বন্দর নীতির অনিশ্চয়তা ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বাণিজ্য প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একইসাথে, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান চীনা আর্থিক প্রভাব ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, ড. ইউনূস বেইজিং–এ সফরকালে একাধিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যার মধ্যে ছিল ২ বিলিয়ন ডলারের “ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিকনস্ট্রাকশন লোন”।
কিন্তু এর শর্তাবলি প্রকাশ না করায় অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
‘মানবিক অর্থনীতি’ নাকি রাজনৈতিক অর্থনীতি?
ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠরা যুক্তি দেন—
তার লক্ষ্য ছিল মানবিক অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে মুনাফার চেয়ে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাজার ও মুদ্রানীতির ভারসাম্য নষ্ট হলেই মানবিকতার জায়গায় আসে সংকট।
ThePrint একে তুলনা করেছে “রাজনৈতিক অর্থনীতির অন্ধকার গর্তের সঙ্গে”—
যেখানে নীতি নয়, নেতৃত্বের অনিশ্চয়তাই অর্থনৈতিক ব্যর্থতার মূল কারণ।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়—
“The Nobel laureate has failed to balance idealism with pragmatism. His governance model is collapsing under its own moral weight.”
দেশীয় প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিক্রিয়া মিশ্র।
কিছু ব্যবসায়ী ইউনূসের স্বচ্ছতা উদ্যোগকে ইতিবাচক বললেও, অধিকাংশই নীতিনির্ধারণে এলোমেলোতা ও বাজারভীতির অভিযোগ তুলেছেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের এক সদস্য মন্তব্য করেন— “আমরা চাই স্থিতিশীল বাজার, পরীক্ষাগার নয়।”
ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা: কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব?
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট কাটাতে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি—
1️⃣ নীতিনির্ধারণে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
2️⃣ প্রশাসনে অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও আমলাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
3️⃣ আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধারে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রকাশ করতে হবে।
ThePrint-এর উপসংহার:
“Bangladesh doesn’t need a philosopher right now. It needs a manager.”
রেফারেন্স লিংক
- ThePrint – Asia’s Weakest Link: Yunus on a Tightrope as Bangladesh Tries to Fix Banks Without Breaking Economy (2025)
- The Business Standard – Economic Reforms Under Yunus Regime Reviewed (2025)
- Dhaka Tribune – Banking Uncertainty Deepens Under Interim Govt (2025)
