অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের অদক্ষতা ও নীতিগত শিথিলতায় ডলার পাচার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বাণিজ্য ঘাটতি, ওভার-ইনভয়েসিং ও ডলার বহির্গমনে আতঙ্ক।
অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের আর্থিক নীতির অস্থিরতা, আমদানি ব্যবস্থায় শিথিলতা এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ডলার পাচার। রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবাহ থাকলেও, ডলারের অস্বাভাবিক বহির্গমন বৈদেশিক বাণিজ্যে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে—যা অর্থনীতিবিদদের কাছে স্পষ্ট সতর্কসংকেত।
বাণিজ্য ঘাটতির তীব্র বৃদ্ধি: পাচারের ছাপ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে—
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৭১ কোটি ডলারে, যা গত বছরের তুলনায় ২৫% বেশি।
- রপ্তানি আয়: ১,১০৮.৭০ কোটি ডলার
- আমদানি ব্যয়: ১,৬৮০ কোটি ডলার
হঠাৎ বাড়তি আমদানি ব্যয় এবং ডলারের দ্রুত বাইরে চলে যাওয়া—
বিশেষজ্ঞদের মতে ওভার-ইনভয়েসিং ও ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিংয়ের ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: পাচার আগের চেয়েও বেশি
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন—
“রেমিট্যান্স ও রপ্তানি স্থিতিশীল হলেও বিপুল অঙ্কের ডলার কোথায় যাচ্ছে তার ব্যাখ্যা নেই—এটি স্পষ্ট অর্থপাচারের লক্ষণ।”
একই মত দিয়েছেন টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান—
“৫ আগস্টের পর পাচার বন্ধ হয়নি, বরং সুযোগ বাড়ায় পাচারও বেড়েছে।”
তাদের মতে—
ইনভয়েসিং জালিয়াতি, ভ্রমণ-চিকিৎসা ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং শিথিল আমদানি নীতি পাচারচক্রের পুরোনো পথগুলো আবারও খুলে দিয়েছে।
ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং: পাচারের ৭৫% একই পথ
বিআইবিএম ও এনবিআরের যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে—
বাংলাদেশে পাচার হওয়া অর্থের ৭৫% হচ্ছে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের মাধ্যমে।
- ওভার-ইনভয়েসিং
- আন্ডার-ইনভয়েসিং
- মিথ্যা মূল্য ঘোষণা
- কাগুজে আমদানি
শুল্ক গোয়েন্দার ৯৫টি মামলা বিশ্লেষণ বলছে—
৩,২০১ কোটি টাকার পাচার প্রমাণিত, যা কেবলমাত্র শনাক্ত হওয়া অংশ।
বিদেশি বিনিয়োগ কমছে, কিন্তু পাচারে সক্ষম গোষ্ঠী সক্রিয়
রেমিট্যান্স ও এফডিআই বাড়লেও—
বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণাত্মক, যা বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার স্পষ্ট চিত্র।
অন্যদিকে পাচারচক্র—
- শিথিল আমদানি নীতি
- দুর্বল নিয়ন্ত্রণ
- অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ
এই তিনটিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ: যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশ ব্যাংক ওভার-ইনভয়েসিং বন্ধে— মূল্য যাচাই, নথি রিপোর্টিং, এলসি তদারকি—এসব বাধ্যতামূলক করেছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে—
নীতিগত নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই পাচার ঠেকানো অসম্ভব।
ইউনূস সরকারের ব্যর্থতা: অদক্ষতা থেকে অনিয়ম
অর্থনীতিবিদ ড. জামাল উদ্দিন বলেন—
“এখনকার মূল সমস্যা নিয়ন্ত্রণহীন আমদানি নীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা। পাচার ঠেকাতে ব্যর্থ হলে পুরোনো অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা অর্থহীন হবে।”
ইউনূস সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি ১৬ বছরে ২৮ লাখ কোটি টাকার “পাচার তত্ত্ব” দিলেও তার কোনো তথ্য-প্রমাণ না থাকায় তা বিতর্কিত হয়ে পড়ে।
উল্টো এখন নতুন পাচার আরও বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—
সরকার কি আসলে পাচার রোধে সক্ষম?
অর্থনীতি কঠিন ঝুঁকির মুখে
ডলারের অস্বাভাবিক বহির্গমন, ওভার-ইনভয়েসিং, রেমিট্যান্স প্রবাহের বিপরীতে ডলার সংকট—
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ গুরুতর আর্থিক ঝুঁকির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়—
“যদি পাচার বন্ধ না হয়, তাহলে অর্থনীতি কোনো স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবে না।”
