১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের পেরুয়ায় রাজাকারদের নৃশংস গণহত্যা, নির্যাতন ও নারকীয় সহিংসতার বিস্মৃত ইতিহাস। এখনো নেই কোনো স্মৃতিস্তম্ভ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে শুরু হয় নজিরবিহীন গণহত্যা, যার ধারাবাহিকতায় নয় মাসে শহীদ হন প্রায় ৩০ লাখ বাঙালি। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও দেশের বহু বধ্যভূমি যেমন অবহেলিত, তেমনি ইতিহাসের অনেক নির্মম অধ্যায় মানুষকে জানানো হয়নি। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার পেরুয়া গণহত্যা এমনই একটি বিস্মৃত ঘটনা।
সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে রাজাকার বাহিনীর তাণ্ডব
পেরুয়া ছিল হিন্দু অধ্যুষিত শান্তিপূর্ণ একটি গ্রাম। নদীর ওপারে শ্যামারচর ও উজানগাঁও এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল বিভিন্ন স্থান থেকে আসা তথাকথিত ‘সেটেলার মুসলিম’ জনগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর প্রভাবশালী অংশ—উজানগাঁওয়ের খালেক মিয়া এবং বাহারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফত মিয়া—১৯৭১ সালে বড়সড় রাজাকার বাহিনী গঠন করে সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে লুট, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চালায়।
ডিসেম্বরের প্রথম দিকে পাকিস্তান বাহিনী সুনামগঞ্জ ত্যাগ করলে খালেক মিয়ার নেতৃত্বে রাজাকাররা উজানগাঁওকে ক্যাম্প বানায় এবং আশপাশের গ্রাম সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে।
৬ ডিসেম্বর: মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের পর নরকযজ্ঞ
৬ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিযোদ্ধা অধিনায়ক সুধীর কুমার দাস নেতৃত্বে রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ চালান। তীব্র লড়াইয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। সেই সুযোগে রাজাকার বাহিনী নদী পার হয়ে পেরুয়ায় আক্রমণ চালায়।
গ্রামে ঢুকেই তারা:
- নির্বিচারে গুলি ছোড়ে
- ঘরে ঘরে অগ্নিসংযোগ করে
- কিশোরী-তরুণীদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করে
- লুট করে নিয়ে যায় সোনাদানা, অর্থ, খাদ্য
অতর্কিতে আক্রান্ত গ্রামবাসী দুই কিলোমিটার দূরে এলংজুড়ির জঙ্গলে পালিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু রাজাকাররা সেখানেও পৌঁছে নারী-পুরুষকে আলাদা করে রামচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়ে আসে।
পুরুষদের গণহত্যা, নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন
পুরুষদের ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন, এরপর সবাইকে নদীর ঘাটে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
নারীদের বলা হয় ‘নিরাপদে পাঠানো হবে’, অথচ ক্যাম্পে নিয়ে তাদের ওপর তিনদিন ধরে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়।
সেদিন শৈলেন কুমার রায়ের পরিবারের ৬ জন সদস্যসহ বহু মানুষ নির্মমভাবে নিহত হন।
গুঞ্জর আলী ও কুলসুম বিবির করুণ অধ্যায়
নদী পার করাতে বাধ্য করা দিনমজুর ব্রজেন্দ্র দাস গুলিবিদ্ধ হলেও বেঁচে যান। পরে তাকে আশ্রয় দেওয়ায় রাজাকাররা গ্রামের মানুষ
গুঞ্জর আলীকে রাইফেলের আঘাত ও গুলিতে হত্যা করে এবং তার স্ত্রী কুলসুম বিবিকে অপহরণ করে তিনদিন নির্যাতন করে।
বাড়ি ফিরলে কুলসুম বিবি দেখেন:
- তার সন্তানরা ক্ষুধায় অচেতন
- স্বামীর লাশ কুকুর-বিড়ালে খাচ্ছে
- গ্রামবাসী তাকে ‘খারাপ মেয়ে’ আখ্যা দিয়ে বর্জন করছে
পরে সমাজসচেতন বাঁশ ব্যবসায়ী কালা মিয়া তাকে বিয়ে করে দুই সন্তানকে লালনপালন করেন—যা মানবিকতার বিরল দৃষ্টান্ত।
প্রমীলা দাসের ওপর নির্যাতন
রাজাকাররা গুঞ্জর আলীকে না পেয়ে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী প্রমীলা দাসকে নির্যাতন করে। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জীবিত ব্রজেন্দ্র দাস আজও সে দিনের বিভীষিকাময় স্মৃতি বহন করেন।
বধ্যভূমি আজও অবহেলিত
পেরুয়া গ্রামে যেখানে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, সেখানে এখনো কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী সরকারিভাবে স্মৃতিস্তম্ভের দাবি জানিয়ে আসছে।
এটি কেবল একটি গ্রামের ইতিহাস নয়—এটি বাঙালির জাতিগত গণহত্যার সাক্ষ্য, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।
পেরুয়া বধ্যভূমি: ৬ ডিসেম্বরের বিস্মৃত গণহত্যা
লেখকঃ লে. কর্ণেল (অব.) সাজ্জাদ আলী জহির, বীরপ্রতীক, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত
