২০১৩ সালের শাপলা চত্বর অভিযানে মৃত্যুহীনতার দাবি তুললেন সাবির মুস্তাফা। সরকারি ও বেসরকারি তথ্যবিভ্রান্তির মাঝে সত্য যাচাইয়ের নতুন প্রশ্ন।
শাপলা চত্বর ২০১৩: সাবির মুস্তাফার দাবিতে নতুন বিতর্ক ,২০১৩ সালের ৫–৬ মে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বর অবস্থান কর্মসূচি—যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি—পুনরায় আলোচনায় এসেছে বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফার মন্তব্যকে ঘিরে।
সম্প্রতি চ্যানেল আই–এর ‘স্টেট অব কার্ড’ টকশোতে তিনি বলেন—
“সেদিন রাতে শাপলা চত্বরে কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ নেই। গণহত্যার দাবি আদৌ প্রমাণিত হয়নি।”
তার এই বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে ওই রাতে একটি বড়মাপের দমন–পীড়ন ও গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল।
কি বললেন সাবির মুস্তাফা?
সাবির মুস্তাফা—যিনি ২০১৩ সালে বিবিসির ঢাকা ব্যুরো প্রধান ছিলেন—স্টুডিও আলোচনায় বলেন:
- রাত ৩টার পর বিবিসি টিম ঘটনাস্থলে ছিলেন
- তারা সরাসরি অভিযান পর্যবেক্ষণ করেছেন
- কোথাও লাশের স্তূপ বা গুলিতে নিহতের দৃশ্য শনাক্ত করেননি
- কোন নির্ভরযোগ্য উৎস বা হাসপাতালও মৃতদেহের তথ্য দিতে পারেনি
তার ভাষ্য অনুযায়ী—
“যে সংখ্যাগুলো পরে অনলাইনে ভাইরাল হয়েছিল, সেগুলো যাচাইযোগ্য ছিল না।”
গণহত্যা দাবির উৎপত্তি: কীভাবে বিভ্রান্তি ছড়ালো?
সোশ্যাল মিডিয়া, বিভিন্ন দলীয় প্রচার, বিদেশি প্ল্যাটফর্ম—সব জায়গায় ২০১৩ সালের পর “হাজারো মানুষ নিহত”,
“রাতের আঁধারে লাশ সরানো”—এমন দাবি ভাইরাল হয়। কিন্তু:
- সরকারী হিসাব: ১১–১৩ জন (দিনভর সংঘর্ষসহ)
- কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা “গণহত্যা” হিসেবে ঘটনাটি স্বীকৃতি দেয়নি
- HRW, Amnesty—উভয়েই তদন্ত দাবি করলেও “mass killing” শব্দ ব্যবহার করেনি
- প্রকাশ্য রিপোর্টে “রাতের অভিযানে সমষ্টিগত মৃতদেহ” পাওয়ার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই
এই প্রমাণ সংকট থেকেই সাবির মুস্তাফা বলেন—
“গণহত্যা শব্দের ব্যবহার তথ্যভিত্তিক ছিল না—বরং রাজনৈতিক।”
হেফাজতের দাবি ও পরবর্তী বিতর্ক
হেফাজতে ইসলাম শুরুতে হাজারো হতাহতের দাবি তুলেছিল।
২০২৫ সালে তারা নতুন করে ৯৩ জন নিহতের খসড়া তালিকা প্রকাশ করে, তবে তার বেশিরভাগ তথ্য এখনও যাচাইপরীক্ষার পর্যায়ে।
তালিকায়—
- অনেক নামের পরিবার বা ঠিকানা মেলেনি
- কিছু নাম আগের মানবাধিকার তালিকার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি
- লাশ, হাসপাতালের সার্টিফিকেট বা আইনি ডকুমেন্ট নেই
ফলে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে:
আসলে কী ঘটেছিল?
ইউনুস সরকারের “প্রমাণ দিন” চ্যালেঞ্জ
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন সদস্য সম্প্রতি প্রকাশ্যে বলেছেন—
“যদি সত্যিকারের গণহত্যা হয়ে থাকে, তবে প্রমাণ দাখিল হোক।”
এদিকে সাবির মুস্তাফার মন্তব্য তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ঘটনাটিকে “মৃত্যুহীন অভিযান” বলা যায় কি?
এখানে সতর্ক থাকা জরুরি।
কারণ—
- দিনব্যাপী সংঘর্ষে নিশ্চিতভাবেই মৃত্যু হয়েছিল
- রাতের অভিযানের নির্দিষ্ট প্রমাণ দুর্বল, কিন্তু “শূন্য” বলার মতো সমন্বিত সরকারি–অসরকারি তদন্ত হয়নি
- বহু পরিবারের নিখোঁজ অভিযোগও ছিল
সুতরাং “কোনো মৃত্যু হয়নি”—এটি একপক্ষের দাবি, কিন্তু “অবশ্যই মৃত্যু হয়েছিল”—এটাও অন্য পক্ষের দাবি,
এবং দুটি অবস্থানই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত বলা যায় না।
সাবির মুস্তাফার বক্তব্য শাপলা চত্বর ঘটনার প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তার মন্তব্য প্রমাণ করে—
- ঘটনাটি এখনো পুরোপুরি অনুসন্ধান হয়নি
- রাজনৈতিক প্রচারণা ও সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব বহু বছর সত্যকে আড়াল করেছে
- বাংলাদেশ আজও সেই রাতের নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের অপেক্ষায়
শাপলা চত্বর—২০১৩ এখনো রয়ে গেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত, অথচ অমীমাংসিত ঘটনাগুলির একটি।
