চট্টগ্রামে বিজয় দিবসের শোভাযাত্রায় জামায়াত নেতার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বক্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে নিন্দা ও ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ উঠেছে।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত আয়োজিত যুব শোভাযাত্রায় দেওয়া বক্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সকালে নগরের ২ নম্বর গেট থেকে শুরু হয়ে বহদ্দারহাট মোড়ে শেষ হওয়া শোভাযাত্রার আগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তার বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগেই মুজিব বাহিনী এলাকায় এলাকায় গণহত্যা চালিয়েছিল, আর সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়াতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘ক্র্যাকডাউন’ চালায়। এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ উঠেছে।
জামায়াত নেতার বক্তব্যে কী বলা হয়
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন যুব বিভাগ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি ও নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান হেলালী।
বক্তব্যে মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সময় ইসলামী আদর্শভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শাসকগোষ্ঠী তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়।
তিনি দাবি করেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি।
এরপর তিনি ২৫ মার্চের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “সেই রাতের সঠিক ইতিহাস আমাদের জানানো হয়নি।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুজিব বাহিনীর কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়াতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে।
তিনি আরও বলেন, “২৫ মার্চ দিবাগত রাতে শেখ মুজিবুর রহমান আত্মসমর্পণ করে জেলখানায় আরামে ছিলেন”—যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ভারতীয় সেনা ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গ
জামায়াতের আমির তার বক্তব্যে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, ৬ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধ করে বিজয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
তিনি আরও বলেন, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরিকল্পনায় সংঘটিত হয়—
যা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন গবেষকরা।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী বিজয়ের দিন কোথায় ছিলেন এবং আত্মসমর্পণ দলিলে কেন তাকে স্বাক্ষর করতে দেওয়া হয়নি।
গবেষকদের পাল্টা বক্তব্য
মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ও গবেষক মাহফুজুর রহমান জামায়াত নেতার বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, মুজিব বাহিনী গঠিত হয় ১৯৭১ সালের জুন-জুলাই মাসে। সুতরাং ২৫ মার্চের আগে তাদের দ্বারা গণহত্যা চালানোর প্রশ্নই আসে না।
তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
মুক্তিযুদ্ধপন্থী সমাজে ক্ষোভ
জামায়াত নেতার বক্তব্যের পর মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, ইতিহাসবিদ ও স্বাধীনতাপ্রেমী সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
তাদের মতে, জামায়াতে ইসলামী বরাবরই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে ইতিহাসকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রজন্মের কাছে সত্য তুলে ধরা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
উপসংহার
বিজয় দিবসের মতো একটি ঐতিহাসিক দিনে দেওয়া এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়,
বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাসকে ঘিরে একটি গভীর সংকেত হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশ্ন উঠছে—এই ধরনের বক্তব্য কি পরিকল্পিতভাবে ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা, নাকি রাজনৈতিক মেরুকরণের নতুন অধ্যায়?
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ আশা করছেন, ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে উঠবে এবং সত্যই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে।
