হুজি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক ও মাদ্রাসা সফর: ঢাকায় শীর্ষ তালেবান নেতা মোল্লা নুর আহমদের গোপন উপস্থিতি ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি যখন নির্বাচনমুখী উত্তেজনা, সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে—ঠিক সেই সময় ঢাকায় গোপন সফরে এসেছেন আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদ (হুজি) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সমমনা কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে তার একাধিক বৈঠক নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্রীয় নজরদারি, কূটনৈতিক স্বচ্ছতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে।
কে এই মোল্লা নুর আহমদ নুর?
গোপন সফরে থাকা এই ব্যক্তি হলেন মোল্লা নুর আহমদ নুর, যিনি মোল্লা জাওয়ান্দি নামেও পরিচিত। তিনি তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফার্স্ট পলিটিক্যাল ডিভিশনের মহাপরিচালক—অর্থাৎ আফগানিস্তানের কূটনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তি।
সূত্র অনুযায়ী, তিনি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছেন এবং নিয়মিতভাবে বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা ও ধর্মীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
কার সহায়তায় এই সফর?
এয়ারলাইন্স সূত্র জানায়, মোল্লা জাওয়ান্দি ২১ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ–আফগানিস্তান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আবু সায়েম খালেদ।
এই আবু সায়েম খালেদকে ঘিরেই সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন। গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অতীতে হুজির নারায়ণগঞ্জ জেলা আমির ছিলেন বলে সন্দেহ রয়েছে—যদিও তিনি নিজে তা অস্বীকার করেছেন।
মাদ্রাসা সফর ও বৈঠকের তালিকা
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, মোল্লা জাওয়ান্দি ঢাকায় অবস্থানকালে একাধিক কওমি মাদ্রাসায় যান, যার মধ্যে রয়েছে—
- নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জামিয়া কারামিয়া মাদ্রাসা
- রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদ্রাসা
- মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা
এছাড়া তিনি কয়েকটি বন্ধ বৈঠকেও অংশ নেন, যেখানে উপস্থিত ছিলেন—
- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক
- বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক
- নিষিদ্ধঘোষিত হুজির সন্দেহভাজন একাধিক শীর্ষ নেতা
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই সফর সম্পর্কে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট কিংবা অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম কিংবা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র—কেউই এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি। আফগান দূতাবাসের জনসংযোগ কর্মকর্তাও তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
বিতর্কিত সমাবেশ ও হুজি সংশ্লিষ্টতা
২৭ ডিসেম্বর ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে “Blueprint of the Islamic Emirate” শিরোনামে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক ছিল বিএসিসিআই। এই সমাবেশে মোল্লা জাওয়ান্দির উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি যাননি।
তবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন—
- হুজির সাবেক আমির রহমতুল্লাহ ওরফে শেখ ফরিদ–এর পরিবারের সদস্যরা
- যাদের একাধিকজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার মামলা রয়েছে
অনুষ্ঠানের খাবার সরবরাহ করে আল-মারকাজুল ইসলামী—যার প্রতিষ্ঠাতার পরিবারও আগে বিতর্কে জড়িয়েছে।
নির্বাচন ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন—
- ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনায়
- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে
- দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেছেন, “নির্বাচনের আগে এমন সফর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করে।
এটি সহিংসতার ঝুঁকি ও কূটনৈতিক জটিলতা বাড়াতে পারে।”
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর আফগানিস্তান–বাংলাদেশ সম্পর্কের পাশাপাশি পাকিস্তান ও ভারতের ভূমিকাকেও আলোচনায় আনছে।
তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে বাংলাদেশি কট্টরপন্থী নেতাদের যোগাযোগ এই বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এর আগে তালেবান সরকারের আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত।
শেষ কথা
ঢাকায় শীর্ষ তালেবান নেতার এই গোপন সফর শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়—এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নীরবতা ও স্বচ্ছতার অভাব এই উদ্বেগকে আরও গভীর করছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সফর কি নিছক ধর্মীয় যোগাযোগ, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও গভীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা এজেন্ডা?
