জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের অরাজকতা বন্ধে লাঙ্গল মার্কায় ভোট এবং আসন্ন গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিস্তারিত জানুন আজকের প্রতিবেদনে।
ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘মুমূর্ষু’ ও ‘অরাজক’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের দেশবাসীকে আসন্ন নির্বাচনে লাঙ্গল মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, সংবিধান সংস্কারের লক্ষে আয়োজিত আসন্ন গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি। সোমবার গভীর রাতে নিজের ও দলের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।
উল্লেখ্য যে, সেদিন বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রধান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিটিভিতে ভাষণ দিলেও সেখানে জাপা চেয়ারম্যানের উপস্থিতি ছিল না। পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি তাঁর এই বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।

“দেশ আজ এক মৃত্যুপুরী”: সরকারের প্রতি কঠোর সমালোচনা
ভিডিও বার্তায় জি এম কাদের দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বিদ্বেষ আর বিভাজন আজ দেশের ১৮ কোটি মানুষকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইনসাফ আর সাম্যের কথা বলে আজ তৈরি করা হয়েছে চরম বৈষম্য আর দখলদারিত্বের এক অমানবিক রাষ্ট্র।”
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে মন্দির, গির্জা কিংবা মাজারে পৈশাচিক উল্লাস হচ্ছে এবং দিনেদুপুরে প্রতিপক্ষকে খুন করে মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও দোকানে লুটপাটের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র আজ নির্বিকার। এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পূর্বলক্ষণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান: ‘প্রতারণার’ অভিযোগ
আসন্ন গণভোট নিয়ে জি এম কাদের তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর ভাষণের মূল পয়েন্টগুলো হলো:
- লুকিয়ে রাখা পরিবর্তন: বিভ্রান্তিকর ৪টি বিবৃতির আড়ালে সংবিধানের ৩৮টি পরিবর্তন লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
- অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া: সংস্কার হতে হবে নির্বাচিত সংসদ ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে নয়।
- সংঘাতের আশঙ্কা: এই পরিবর্তনগুলো দেশে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করবে।
তিনি বলেন, “সংবিধান নিয়ে সুপরিকল্পিত প্রতারণা চলছে। তাই আসন্ন গণভোটে আপনাদের প্রতি আমার স্পষ্ট বার্তা—সবাইকে ‘না’ ভোট দিতে হবে।”
অর্থনীতি ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ‘হুমকির মুখে’ বর্ণনা করে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, গত কয়েক মাসে শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়েছে এবং বেকারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। তিনি ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা ও রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এছাড়া, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমাদের সীমান্ত আজ অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।”
নারী অধিকার ও সংস্কৃতি রক্ষা: লাঙ্গলের অঙ্গীকার
জি এম কাদের তাঁর বক্তব্যে নারী সুরক্ষা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে জারি-সারি-ভাওয়াইয়া আর কবিতার কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।
তিনি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন যেখানে:
- একজন নারীকে তাঁর পোশাকের জন্য হেনস্তা হতে হবে না।
- শিক্ষক তাঁর ছাত্রের কাছে প্রহৃত হবেন না।
- বাউল, শিল্পী বা ভিন্নমতের কোনো মানুষের টুটি চেপে ধরা হবে না।
- নারী শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে চলাফেরা হবে নিরাপদ।
জুলাই আন্দোলনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে জাতীয় পার্টির সক্রিয় অংশগ্রহণের দাবি করেন জি এম কাদের। তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলাম।” তিনি রংপুরে শহীদ হওয়া জাপা কর্মী মিরাজুল ও মানিকের নাম উল্লেখ করেন এবং জানান যে দলের শত শত নেতাকর্মী মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তিনি শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয় পার্টির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
| বিষয় | অবস্থান/দাবি |
| নির্বাচনী প্রতীক | লাঙ্গল মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান। |
| আসন্ন গণভোট | ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে বার্তা। |
| জুলাই অভ্যুত্থান | জাপার দুই কর্মী শহীদ ও আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের দাবি। |
| বর্তমান রাষ্ট্র | বৈষম্য ও দখলদারিত্বের ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত। |
| সাংস্কৃতিক সুরক্ষা | বাউল ও ভিন্নমতের মানুষের অধিকার নিশ্চিতের অঙ্গীকার। |
উপসংহার: জি এম কাদেরের এই ভিডিও বার্তা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একদিকে জুলাই আন্দোলনের অংশীদার দাবি করা, অন্যদিকে বর্তমান প্রশাসনের সংস্কার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করা—জাতীয় পার্টির এই দ্বিমুখী কৌশল আসন্ন নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
তবে গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার এই আহ্বান সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
