দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল বৈঠকে শেখ হাসিনার নতুন নির্দেশ। দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের যা বললেন নেত্রী।
বিশেষ প্রতিবেদক | বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার সকালে দিল্লির অজ্ঞাত স্থান থেকে দলের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের সাথে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হয়ে তিনি নেতাদের উদ্দেশ্যে এক দ্ব্যর্থহীন বার্তা প্রদান করেছেন। তার নির্দেশনার মূল সারকথা হলো— “প্রস্তুতি নিন, এবার মাঠে নামতে হবে।”
নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আইনি বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর শেখ হাসিনা তার নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে সুসংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান।
এটি গত কয়েক মাসের মধ্যে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বৈঠক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রস্তুতি নিন, দেশে ফিরতে হবে’: নতুন আত্মবিশ্বাসের সুর
দিল্লিতে অবস্থানের পর থেকে শেখ হাসিনার এই প্রথম সরাসরি নির্দেশ— নেতাদের দেশে ফেরার মানসিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে হবে।
বৈঠকে উপস্থিত এক প্রেসিডিয়াম সদস্যের বরাত দিয়ে জানা যায়, নেত্রীর কণ্ঠে সেই পরিচিত দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা গেছে।
অনেক নেতার ধারণা, দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে পর্দার আড়ালে কোনো ইতিবাচক সংকেত বা আন্তর্জাতিক বার্তা তিনি পেয়ে থাকতে পারেন।
শেখ হাসিনা বলেন,
“নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো আদর্শবাদী দলকে দমানো যায় না। আপনারা প্রস্তুতি নিন, মানুষের কাছে যেতে হবে এবং বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে।”
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: ‘সাজানো নাটক’ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনা তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি এই নির্বাচনকে একটি ‘প্রহসন’ এবং ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে অভিহিত করেন।
পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা: শেখ হাসিনা দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের দ্বিমুখী আচরণের কঠোর নিন্দা জানান।
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রশংসা করে গেলেও নিজ দেশে গিয়ে নেতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছেন।
ভোটের হার: ৬০ শতাংশ ভোটের যে দাবি করা হয়েছে, সেটিকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, মানুষ তার ভোট বর্জনের ডাকে ব্যাপক সাড়া দিয়েছে।
নির্বাচনের আগের দিন থেকেই ব্যালট বাক্স ভর্তির অভিযোগ তুলে তিনি বর্তমান সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান।
নিষেধাজ্ঞা ও আইনি বৈধতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ
আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর বর্তমানে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তাকে ‘অবৈধ’ বলে দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তার যুক্তি প্রধানত দুটি:
সন্ত্রাস দমন আইনের অপপ্রয়োগ: আওয়ামী লীগ কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়নি যে কারণে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে তিনি ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তাদের দেওয়া কোনো নির্দেশ আইনত বৈধ হতে পারে না।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বর্তমান বিএনপি সরকার এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে।
অন্যথায় আওয়ামী লীগ নিজস্ব পন্থায় কর্মসূচি ঘোষণা করে মাঠে নামবে।
বৈঠকে অনুপস্থিত ও উপস্থিত নেতৃত্ব
মঙ্গলবারের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত ছিলেন দলের প্রভাবশালী নেতারা,
যার মধ্যে জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, বাহাউদ্দিন নাছিম এবং মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অনুপস্থিতি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকরা নিজ নিজ এলাকার বর্তমান রাজনৈতিক চিত্র নেত্রীর সামনে তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ত্রয়োদশ সংসদের ভবিষ্যৎ
শেখ হাসিনা জোর গলায় দাবি করেছেন যে, আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনের ফলাফলকে শেষ পর্যন্ত অনুমোদন দেবে না।
তিনি মনে করেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি আরও গতিশীল হবে।
দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির বিশ্লেষক এবং ভারতীয় গণমাধ্যম ‘আনন্দবাজার’ বা ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর মতো পোর্টালগুলোতে প্রায়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের মতো বড় রাজনৈতিক শক্তিকে মাঠের বাইরে রেখে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
শেখ হাসিনার এই ভার্চুয়াল বৈঠক মূলত সেই জনবলকে পুনরায় সংহত করার একটি কৌশল।
রাজপথের লড়াইয়ের ডাক
পরিশেষে, শেখ হাসিনার এই বার্তা আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে পারে।
একদিকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে নেত্রীর ‘মাঠে নামার’ নির্দেশ— এই দুই বিপরীতমুখী স্রোত বাংলাদেশের রাজনীতিকে আগামী দিনে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে এটা স্পষ্ট যে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘস্থায়ী নির্বাসন বা নীরবতা ভেঙে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার নীল নকশা তৈরি করছে।
