পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও নিরাপত্তার আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও একদল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। আঞ্চলিক অস্থিরতা ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
বিশেষ প্রতিবেদক | পার্বত্য চট্টগ্রাম
সবুজ পাহাড় আর মেঘের দেশ পার্বত্য চট্টগ্রাম। বিগত কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে পাহাড়ে শান্তি বজায় রাখার কথা বলা হলেও, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য ভিন্ন এক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তার সাথে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এক ধরণের গোপন ও ব্যবসায়িক সমঝোতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পিসিজেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সাথে কতিপয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার অস্বাভাবিক যোগাযোগ এবং যৌথ অবস্থানের খবর পাহাড়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভগবানটিলা ও কাত্তলী: যৌথ অবস্থানের নেপথ্যে কী?
২০২৬ সালের ১১ মার্চ মধ্যরাত থেকে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং ইউনিয়নের ভগবানটিলা এলাকায় এক চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, ভগবানটিলা বিজিবি ক্যাম্পের আশেপাশে প্রায় ৪০-৫০ জন সেনা সদস্যের অবস্থানের পাশাপাশি মাত্র ৫০০ গজের ব্যবধানে পিসিজেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডাররা অবস্থান নিয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে রাঙামাটির লংগদু জোন সংলগ্ন কাত্তলী এলাকাতেও।
গত ১২ মার্চ দুপুরে একটি বিশেষ সেনাদল যখন অন্য আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে নামে, তখন তাদের সাথে অতি সন্নিকটে পিসিজেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদেরও দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে যে দূরত্ব থাকার কথা, সেখানে এই ধরণের ‘ছায়া অবস্থান’ জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।



অস্ত্র ও গোলাবারুদ: পাচার না কি কৌশলগত লেনদেন?
পাহাড়ের রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিশ্বস্ত গোয়েন্দা সূত্রে একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
মাটিরাঙ্গা ও লংগদু জোনের নির্দিষ্ট কয়েকজন কমান্ডারের বিরুদ্ধে পিসিজেএসএস (সন্তু) গ্রুপকে অস্ত্র ও গুলি সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই অস্ত্রশস্ত্রগুলোর উৎস কোথায়?
যদি এই হাতিয়ারগুলো সরকারি মজুদ থেকে না এসে থাকে, তবে এর পেছনে বড় ধরণের কোনো সিন্ডিকেটের হাত থাকতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা অন্য কোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাত ঘুরে আসা এসব অবৈধ অস্ত্র পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই ধরণের কার্যক্রম যদি ব্যক্তিগত লাভের জন্য হয়ে থাকে, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ও দাতা সংস্থাগুলোর তহবিল
পার্বত্য চট্টগ্রামের অরাজকতার পেছনে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ‘অর্থ’ কাজ করছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
অভিযোগ রয়েছে, পিসিজেএসএস (সন্তু) গ্রুপ গত ২৭ বছর ধরে কোনো নির্বাচন ছাড়াই আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা ভোগ করছে।
এই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশের সমর্থন পেতে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে।
এই অর্থের উৎস হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ কিংবা জেলা পরিষদগুলোর জন্য বরাদ্দ করা উন্নয়ন তহবিল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো পাহাড়ে শান্তির জন্য যে অর্থ ব্যয় করছে, তার একটি বড় অংশ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে এবং সেখান থেকে অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে কি না—তা এখন বড় প্রশ্ন।
কৌশলগত দূরত্ব রক্ষার নির্দেশনা: লোকদেখানো সতর্কতা?
মাঠপর্যায়ের একটি গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, সম্প্রতি নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা পিসিজেএসএস (সন্তু) ক্যাডারদের অনুরোধ করেছেন যাতে তারা জনসম্মুখে বাহিনীর সাথে চলাফেরা না করে। সাধারণ মানুষের নজর এড়াতে এবং তথাকথিত ‘পাবলিক ইমেজ’ ঠিক রাখতে এই ‘দূরত্ব বজায় রাখা’র নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবের চিত্র ভিন্ন।
পাহাড়ের দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনও নিরাপত্তা টহল এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর মুভমেন্ট একই সূত্রে গাঁথা বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
চাঁদাবাজি ও সাধারণ জুম্মদের জীবনযাত্রা
পাহাড়ে সাধারণ জুম্ম জনগোষ্ঠীর জীবন আজ দুই পাহাড়ের চাপে পিষ্ট।
একদিকে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়মিত ট্যাক্স বা চাঁদা, অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশের কথিত প্রশ্রয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন জুম্ম সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে আদায়কৃত চাঁদার একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এর বিনিময়ে ওইসব কর্মকর্তাদের কেবল শারীরিক উপস্থিতিই ‘অপারেশন’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে প্রকৃত অর্থে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো প্রচেষ্টা থাকে না।
আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি ও শান্তিরক্ষা মিশনে প্রভাব
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করে আসছে।
কিন্তু দেশের ভেতরে পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র পাচার, দুর্নীতি বা সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদকে অর্থায়নের অভিযোগ ওঠে,
তবে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলতে পারে।
মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বিভাগের (UN Peacekeeping) উচিত এই ধরণের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নাম ও কর্মকাণ্ড নথিবদ্ধ করা,
যাতে কোনো ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত লালসার দায় পুরো বাহিনীকে নিতে না হয়।
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ সংকট
পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক স্পর্শকাতর অঞ্চল।
ভারতের সেভেন সিস্টার্স সংলগ্ন এই পাহাড়ে যদি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবৈধ সখ্যতা বজায় থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য যারা পাহাড়কে বারুদের স্তূপে পরিণত করছেন, তাদের চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি।
জবাবদিহিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল অস্ত্রের ভাষা নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
পাহাড়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উঠা এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর যদি নিরপেক্ষ তদন্ত না হয়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে।
দাতা সংস্থাগুলোর উচিত তাদের তহবিলের যথাযথ ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা এবং সরকারকে পাহাড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় চাপ দেওয়া।
পাহাড় কেবল পর্যটনের জায়গা নয়, এটি আমাদের মানচিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একে ব্যক্তিগত টাকা আয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে এখনই।
