বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলে হামে আক্রান্ত শিশুদের মুখে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ। মাস্ক সংকটে বিপন্ন শৈশব। অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা।
দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) মানবিকতা ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক চরম অবমাননাকর চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব যখন তুঙ্গে, তখন এই হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি হওয়া শিশুদের মুখে অক্সিজেন মাস্কের বদলে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ গৃহস্থালির প্লাস্টিকের পট বা কাটা বোতল। এই ভয়াবহ ‘দেশি প্রযুক্তির’ চিকিৎসায় শিশুদের জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
অক্সিজেন মাস্কের বদলে গামছা ও প্লাস্টিক: এক আদিম বাস্তবতা
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের হাম আইসোলেশন ইউনিটে গেলে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অসুস্থ শিশুর মাথায় চাপানো হয়েছে প্লাস্টিকের পুরনো পট, যার ওপরে ফুটো করে ঢোকানো হয়েছে অক্সিজেনের নল। মুখ ও নাকের অংশটি ঢাকা দেওয়া হয়েছে এক টুকরো গামছা বা নোংরা কাপড় দিয়ে। কয়েকশো টাকার একটি ‘হেডমাস্ক’ বা অক্সিজেন মাস্কের অভাবে কোটি টাকার বাজেটের এই হাসপাতালে এমন আদিম পদ্ধতিতে চিকিৎসা চলছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারীরাই তাদের এই প্লাস্টিকের পট সংগ্রহ করতে বলেছেন। এক বিছানায় তিন-চারজন করে শিশু গাদাগাদি করে থাকছে, যেখানে হামের মতো সংক্রামক ব্যাধি আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
পরিচালকের স্বীকারোক্তি: ‘নিরাপদ নয়, তবে উপায় নেই’
বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালের পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করেছেন যে, এই পদ্ধতিটি মোটেও বৈজ্ঞানিক বা নিরাপদ নয়। প্লাস্টিকের পটের ধারালো অংশ লেগে যেকোনো সময় শিশুর শরীরের ক্ষত তৈরি হতে পারে বা বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তার দাবি, বর্তমানে মাস্কের সরবরাহ নেই। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, আগামী ১০-১২ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চলে আসবে। প্রশ্ন উঠেছে, এই দীর্ঘ সময় কি অসুস্থ শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপেক্ষা করবে?
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যদশা
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বর্তমান প্রশাসনের জনস্বার্থের প্রতি চরম উদাসীনতাই এই সংকটের মূলে।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণহীন সেই নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি সরকারের আমলে সাধারণ মানুষের নূন্যতম চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারটুকুও আজ ভূলুণ্ঠিত।
অনেকেই ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সেই ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার স্মৃতি আওড়াচ্ছেন।
সমালোচকদের মতে, সেই একই ধারায় বর্তমান সরকারও স্বাস্থ্য খাতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় নূন্যতম স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
কয়েকশো টাকার মাস্ক সরবরাহ করতে না পারা কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের প্রতি সুচিন্তিত অবজ্ঞা।
কোটি টাকার যন্ত্র বনাম সাধারণ মাস্ক: প্রকট বৈপরীত্য
হাসপাতালটিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বড় বড় অপারেশন থিয়েটার বা মেশিনারি কেনা হলেও সাধারণ ও প্রাথমিক সরঞ্জামের অভাব সবসময়ই প্রকট।
চিকিৎসকদের একটি অংশ বলছেন, কেনাকাটার ক্ষেত্রে যেখানে বড় কমিশন পাওয়া যায়, সেখানেই কর্তৃপক্ষের আগ্রহ বেশি।
বিপরীতে অক্সিজেন মাস্ক বা সাধারণ স্যালাইনের মতো কম দামী কিন্তু জরুরি সরঞ্জামগুলো প্রায়ই ‘স্টক আউট’ থাকে।
বরিশালের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, “একটি রাষ্ট্র যখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখে প্লাস্টিকের বোতল চেপে ধরে অক্সিজেন নিশ্চিত করতে চায়, তখন সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।”
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও প্রাণহানির আশঙ্কা
প্লাস্টিকের পটের চারপাশ ধারালো হওয়ায় শিশুদের নড়াচড়ায় যে কোনো সময় রক্তপাত হতে পারে।
এছাড়া গামছা দিয়ে ঢেকে রাখার ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড পুনরায় শিশুর ফুসফুসে প্রবেশের ঝুঁকি থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি জীবনঘাতী ব্যবস্থা। দায়সারা এই ব্যবস্থাপনার ফলে যদি কোনো শিশুর প্রাণহানি ঘটে, তবে তার দায়ভার কে নেবে? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ না কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়?
দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন
বরিশাল শেবাচিমের এই পরিস্থিতি কেবল দক্ষিণাঞ্চলের নয়, বরং সারা দেশের স্বাস্থ্য খাতের কঙ্কালসার অবস্থাকেই তুলে ধরছে।
অনতিবিলম্বে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এখানে মানসম্মত অক্সিজেন মাস্ক সরবরাহ করা জরুরি।
শিশুদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যে কোনো সময় বড় ধরনের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
১০-১২ দিনের সরকারি আশ্বাস নয়, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ চায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
