কক্সবাজারের উখিয়ায় আ.লীগ নেতার বাড়িতে অভিযান। ৬ বছরের মাইরা মনি ও ৭৫ বছরের বৃদ্ধ দাদাসহ পরিবারের নারী সদস্যরা এখন শ্রীঘরে। দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা।
নিজস্ব প্রতিবেদক | কক্সবাজার ১৪ এপ্রিল, ২০২৬;
আইনের শাসন আর মানবাধিকার যখন কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন ছয় বছরের শিশুর শৈশবও অন্ধ কুঠুরিতে বন্দি হয়। এমনই এক হৃদয়বিদারক ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের উখিয়ায়। একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের আটক করতে গিয়ে ছয় বছরের কোমলমতি শিশু মাইরা মনি থেকে শুরু করে ৭৫ বছর বয়সী অশীতিপর বৃদ্ধকেও কারাগারে পাঠিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সচেতন মহলে তীব্র নিন্দা, ঘৃণা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
উখিয়ার সেই মধ্যরাতের অভিযান: যা ঘটেছিল
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলাধীন একটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সালাউদ্দিনের বাড়িতে গত রাতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। অভিযানের মূল লক্ষ্য সালাউদ্দিন হলেও তাকে না পেয়ে বাড়িতে থাকা তার পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর চড়াও হয় অভিযানকারীরা।
অভিযানে সালাউদ্দিনের ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবা জাফর আলম, ভাই মিজানের স্ত্রী ফারজানা হাকিম নিথর এবং পরিবারের অন্য নারী সদস্যদের সাথে গ্রেফতার করা হয় সালাউদ্দিনের মাত্র ৬ বছর বয়সী ভাতিজি মাইরা মনিকে। একজন রাজনৈতিক নেতার ‘অপরাধের’ দায়ে তার শিশু সন্তান বা বৃদ্ধ পিতাকে এভাবে আইনের আওতায় আনা দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ওপর বড় ধরণের প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
মাইরা মনি: একটি নিস্পাপ শৈশব এখন শ্রীঘরে
৬ বছর বয়স—যখন একটি শিশুর হাতে থাকার কথা রঙিন পেন্সিল আর খেলার সাথী, তখন মাইরা মনির হাতে উঠেছে কারাফটকের চাবি। আইনের ভাষায় ‘শিশু’ হিসেবে গণ্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন অভিযোগে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলো, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এটি কেবল আইনের ব্যত্যয় নয়, বরং এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
ফারজানা হাকিম নিথর এবং রোজিনা আক্তারের মতো পরিবারের নারী সদস্যদেরও এই অভিযানে ছাড় দেওয়া হয়নি।
শিশুদের ওপর এই ধরণের মানসিক ট্রমা দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অশীতিপর জাফর আলম: ৭৫ বছরেও মেলেনি রেহাই
৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ জাফর আলম বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছেন।
রাজনৈতিক সক্রিয়তা না থাকা সত্ত্বেও কেবল ‘পারিবারিক পরিচয়’ বা ‘নেতার বাবা’ হওয়ার কারণে তাকে এই বয়সে কারাগারে যেতে হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, জাফর আলমকে যখন আটক করা হচ্ছিল, তখন তিনি নড়াচড়া করার মতো শারীরিক অবস্থায় ছিলেন না।
দেশের ‘আইনের শাসন’ যখন অনুপস্থিত থাকে, তখন পুরো দেশটাই যে একটি কারাগারে পরিণত হয়—এই ঘটনাটি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড়
এই গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে নারী ও শিশুদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা একটি সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, “যদি অপরাধী কাউকে না পাওয়া যায়, তবে কি তার পরিবারের শিশুদের জেলে পাঠাতে হবে?
এটাই কি আমাদের আগামীর বাংলাদেশ?”
আইনি বিশ্লেষণ: শিশু আইন ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের ‘শিশু আইন ২০১৩’ অনুযায়ী, কোনো শিশুকে গ্রেফতার বা আটক রাখা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও সংবেদনশীল নির্দেশনা রয়েছে।
একটি ৬ বছরের শিশুকে প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে বা আলাদাভাবে কোনোভাবেই কারাগারে পাঠানো যায় না।
অথচ মাইরা মনির ক্ষেত্রে এই আইনি সুরক্ষার ন্যূনতম তোয়াক্কা করা হয়নি।
সচেতন সমাজ মনে করে, এই ধরণের কর্মকাণ্ড বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে।
ইনসাফের অপেক্ষায় জনপদ
উখিয়ার এই ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।
শিশু মাইরা মনি এবং বৃদ্ধ জাফর আলমের এই কারাবাস ইতিহাসের পাতায় একটি কালো অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে।
তারেক রহমান সরকারের অধীনে যখন মানুষের ‘শান্তি ও নিরাপত্তার’ কথা বলা হচ্ছে, তখন মাঠ পর্যায়ে এই ধরণের ‘মব জাস্টিস’ বা ‘হয়রানিমূলক অভিযান’ প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছে।
দেশবাসীর প্রত্যাশা, অতিদ্রুত এই নিস্পাপ শিশু এবং বৃদ্ধের মুক্তি নিশ্চিত করা হবে এবং যারা এই অমানবিক নির্দেশের সাথে যুক্ত, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
নয়তো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন হবে।
