দিনাজপুরের বিরামপুরে পুলিশ বক্সের সামনেই ৮ ভরি সোনা লুটের ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বহিষ্কার হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আশিক।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত একটি পুলিশ বক্সের সামনেই ফিল্মি কায়দায় সোনা লুটের ঘটনা ঘটেছে। ফুলবাড়ীর এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সোয়া আট ভরি স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর অভিযোগে ইতিমধ্যে ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত: যেভাবে লুট হলো সোনা
ঘটনাটি ঘটে সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে বিরামপুরের দুর্গাপুর এলাকায় দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর।
ভুক্তভোগী মানিক দত্ত ফুলবাড়ী উপজেলার উত্তর সুজাপুর এলাকার বাসিন্দা এবং ‘মিষ্টি জুয়েলার্স’-এর স্বত্বাধিকারী।
জানা গেছে, মানিক দত্ত তার দোকানের গয়না (আংটি, চেইন, বালা ও নাকফুল) হলমার্ক করার জন্য বিরামপুর গোল্ড হলমার্ক সেন্টারে এসেছিলেন।
কাজ শেষে নিজের সহকর্মী ও মোটরসাইকেল চালক সোহেল রানাকে সাথে নিয়ে তিনি ফুলবাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হন।
কিন্তু ফেরার পথে দুর্গাপুর নামক স্থানে দুটি মোটরসাইকেলে করে আসা ৯ থেকে ১০ জনের একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দল তাদের গতিরোধ করে।
অস্ত্রের মুখে জিম্মি ও মালামাল ছিনতাই
প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ছিনতাইকারীরা দেশীয় অস্ত্রের মুখে মানিক দত্তকে জিম্মি করে ফেলে। এরপর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তার প্যান্টের পকেটে থাকা সোয়া ৮ ভরি ওজনের সোনার পাত এবং মোটরসাইকেল চালকের মানিব্যাগ থেকে নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পুরো ঘটনাটি ঘটেছে একটি পুলিশ বক্সের একদম কাছেই। ছিনতাই শেষে দুষ্কৃতকারীরা নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
গ্রেফতার ও আসামিদের পরিচয়
ঘটনার পরপরই বিরামপুর থানা পুলিশ ব্যাপক অভিযানে নামে। এই ঘটনায় মোট সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়।
পুলিশ অভিযান চালিয়ে চারজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন: ১. আশিক (২৬): বিরামপুর পৌরশহরের কল্যাণপুর মহল্লার রিয়াজুল ইসলাম ওরফে শিয়ালুর ছেলে। তিনি বিরামপুর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
২. আল রেহমান ওরফে অরণ্য (২০): পূর্বপাড়া মহল্লার আনোয়ার হোসেনের ছেলে।
৩. সাগর রহমান (২৪): শিমুলতলী মহল্লার লুৎফর রহমানের ছেলে। ৪. আরিফুল ইসলাম (২০): প্রফেসরপাড়ার মোতালেব হোসেনের ছেলে।
পলাতক ও অন্যান্য অভিযুক্ত
পুলিশ জানায়, এই ঘটনায় আরও কয়েকজন জড়িত যারা বর্তমানে পলাতক। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিরামপুর ৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সোহেল রানা (৪২), ইসলামপাড়ার মো. সানি (১৯) এবং রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত (২৫)। পুলিশ তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
| গ্রেফতারকৃত আসামির নাম | বর্তমান অবস্থা | সাংগঠনিক অবস্থান |
| আশিক | কারাগারে | বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক, স্বেচ্ছাসেবক দল |
| আল রেহমান অরণ্য | কারাগারে | সাধারণ অভিযুক্ত |
| সাগর রহমান | কারাগারে | সাধারণ অভিযুক্ত |
| আরিফুল ইসলাম | কারাগারে | সাধারণ অভিযুক্ত |
দলীয় পদক্ষেপ: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বহিষ্কার
ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর অপরাধে নাম আসায় বিরামপুর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশিককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তার প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ বাতিল করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সংগঠন। অপরাধীর পরিচয় যাই হোক, আইনের কাছে তার কোনো ছাড় নেই—এমন বার্তাই ফুটে উঠেছে এই পদক্ষেপে।
পুলিশের ভাষ্য ও তদন্তের অগ্রগতি
বিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “ব্যবসায়ীর অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমরা তদন্তে নেমেছি। ইতিমধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে লুণ্ঠিত সোনা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আমাদের টিম কাজ করছে, আশা করছি দ্রুতই বাকি আসামিদের ধরা হবে এবং মালামাল উদ্ধার হবে।”
নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে আতঙ্ক
মহাসড়কের ওপরে এবং পুলিশ বক্সের এত কাছে এমন দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, মহাসড়কে পুলিশের টহল আরও জোরদার করা প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।
আইনি প্রক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি
গ্রেফতারকৃত চারজনকে মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ মামলার নথিপত্র এবং সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে লুণ্ঠিত মালামাল দ্রুত পুনরুদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে।
