৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিন পেলেন ঢাবির সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। বিস্তারিত পড়ুন অনলাইন নিউজ পোর্টালে।
ঢাকার উচ্চ আদালত থেকে স্বস্তির খবর পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের জেরে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) উচ্চ আদালতের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
জামিন শুনানির বিস্তারিত
বৃহস্পতিবার বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার এবং বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে ইমির জামিন আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানিতে ইমির আইনজীবীরা দাবি করেন, ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার কোনো অপরাধ হতে পারে না এবং তার বিরুদ্ধে আনীত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অভিযোগটি ভিত্তিহীন।
উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব শেষে আদালত ইমিকে স্থায়ী জামিন প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: শাহবাগের সেই রাত
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের ৭ মার্চ।
ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে শাহবাগ মোড় এলাকায় এক ভিন্নধর্মী কর্মসূচি পালন করতে জড়ো হন শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ কয়েকজন আন্দোলনকারী।
তারা একটি রিকশায় মাইক বেঁধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করতে থাকেন।
সাধারণত রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এই ভাষণ প্রচার করা হলেও, তৎকালীন পরিস্থিতিতে এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রচার চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত হয়ে বাধা প্রদান করেন।
বাধা ও আটকের নাটকীয়তা
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ভাষণ প্রচারের সময় ডাকসুর সাবেক নেতা এ বি জুবায়ের, মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং জাতীয় ছাত্র শক্তির আহ্বায়ক তাহমিদ আল মোদাসসির সেখানে উপস্থিত হন।
তারা ইমির এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেন।
এক পর্যায়ে কথাকাটাকাটি ও হাতাহাতির উপক্রম হলে এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী রিকশাসহ ইমি এবং তার সহযোগীদের টেনে-হিঁচড়ে পার্শ্ববর্তী শাহবাগ থানার ভেতরে নিয়ে যান।
পুলিশি ব্যবস্থা ও মামলা দায়ের
থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ইমি ও তার সহযোগীদের নিজেদের হেফাজতে নেয়।
পরদিন অর্থাৎ ৮ মার্চ পুলিশ বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে’ একটি মামলা দায়ের করে।
ওই মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
প্রায় দুই মাস কারাভোগের পর আজ উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেন এই ছাত্রনেত্রী।
কেন এই বিতর্ক? একটি বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ মার্চের ভাষণ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে এই ভাষণ প্রচারের সময় ও স্থান নিয়ে ভিন্ন মত তৈরি হয়েছে।
ইমির সমর্থকদের দাবি, এটি ছিল একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী কর্মসূচি।
অন্যদিকে, বিরোধীদের দাবি ছিল এই কর্মসূচির মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছিল।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
আইনজীবীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, একটি ভাষণ প্রচারের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ কতটা যৌক্তিক তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাধারণ নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমানা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ইমির এই মামলা।
ইমির রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও জনপ্রিয়তা
শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত মুখ। শামসুন্নাহার হল সংসদের ভিপি হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ও ছাত্র অধিকার সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তার সক্রিয় উপস্থিতি তাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। তার এই গ্রেপ্তার ও পরবর্তীতে জামিনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে যা উঠে এলো
জামিন প্রদানের সময় আদালত উল্লেখ করেন যে, মামলার নথিপত্রে আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের তাৎক্ষণিক প্রমাণ মেলেনি।
এছাড়া দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকা এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইল বিবেচনা করে আদালত তাকে জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
হাইকোর্টের এই জামিন আদেশের ফলে ইমির কারামুক্তিতে এখন আর কোনো আইনি বাধা নেই।
তবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলাটি বিচারিক আদালতে চলমান থাকবে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (IO) আগামীতে অভিযোগপত্র (Charge Sheet) দাখিল করলে বোঝা যাবে এই মামলার চূড়ান্ত গতিপথ কোন দিকে যায়।
শেখ তাসনিম আফরোজ ইমির জামিন পাওয়ার মাধ্যমে একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হলো।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
