রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যয় নিয়ে তারেক রহমানের দাবির চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেন ভারতের চেয়ে রূপপুরের খরচ আলাদা? জানুন কারিগরি ও অর্থনৈতিক প্রকৃত তথ্য।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আধুনিকায়নের পথে সবচেয়ে বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয় পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই মেগা প্রজেক্টের নির্মাণ ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে উত্তপ্ত বাতাস। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিবেশী দেশ ভারতের একটি প্রকল্পের খরচের সাথে তুলনা করে যে দাবি করেছেন, তা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু তথ্যের গভীরতায় গেলে দেখা যায়, এই তুলনা এবং প্রকৃত বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আজকের প্রতিবেদনে আমরা খতিয়ে দেখব রূপপুরের ব্যয়ের পেছনের বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ।
তারেক রহমানের দাবি এবং তথ্যের বিভ্রান্তি
তারেক রহমান সম্প্রতি এক বক্তব্যে দাবি করেছেন, ভারতের কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যেখানে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে একই মানের প্রকল্পের খরচ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যবধানকে তিনি ‘দুর্নীতি’ হিসেবে আখ্যা দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন অন্য কথা। যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে শর্ত, সময়কাল, প্রযুক্তি এবং সরঞ্জামের ধরন না বুঝে স্রেফ অংকের তুলনা করাটা জনসাধারণের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি হাতিয়ার হতে পারে।
রূপপুর প্রজেক্টের কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ
২০১৭ সালে কাজ শুরু হওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৪০০ মেগাওয়াট। ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই মেগা প্রকল্পে রাশিয়া ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে প্রদান করছে।
টার্ন-কি (Turn-key) প্রজেক্টের গুরুত্ব
রূপপুরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এটি একটি ‘টার্ন-কি’ প্রকল্প। এর অর্থ হলো রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি রোসাটাম কেবল কেন্দ্রটি তৈরি করে দিচ্ছে না, বরং এর ডিজাইন, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ, ইনস্টলেশন, কমিশনিং এবং দেশীয় কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ—সবই এই চুক্তির অংশ। এমনকি প্রকল্প চালুর পরবর্তী প্রথম তিন বছরের প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহও এই বাজেটের অন্তর্ভুক্ত। এটি অনেকটা একটি বাড়ি তৈরির মতো, যেখানে নির্মাতা কেবল দেওয়াল তুলে দিচ্ছে না, বরং ফার্নিচার থেকে শুরু করে প্রথম কয়েক বছরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও বহন করছে।
ভারত বনাম বাংলাদেশ: তুলনা যখন অসম
তারেক রহমান ভারতের তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম প্রকল্পের (Kundakulam NPP) উদাহরণ দিলেও দুটি প্রজেক্টের প্রযুক্তিগত এবং সময়গত পার্থক্য আমলে নেননি।
প্রযুক্তির প্রজন্মগত পার্থক্য
- ভারত (VVER-1000): ভারতের কুদানকুলামে ব্যবহার করা হয়েছে দ্বিতীয় প্রজন্মের VVER-1000 রিঅ্যাক্টর। ২০০২ সালে এর প্রথম ধাপের কাজ শুরু হয়। ২৩ বছর আগের প্রযুক্তির দাম বর্তমানের সাথে তুলনা করা অযৌক্তিক।
- বাংলাদেশ (VVER-1200): রূপপুরে ব্যবহৃত হচ্ছে রাশিয়ার সবচেয়ে আধুনিক ৩+ প্রজন্মের VVER-1200 রিঅ্যাক্টর। এটি কেবল শক্তিশালী নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি মোকাবিলায় এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম।
চুক্তি ও স্বনির্ভরতা
ভারত একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তাদের নিজস্ব প্রশিক্ষিত জনবল এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো আগে থেকেই বিদ্যমান। তাই তাদের চুক্তিতে প্রশিক্ষণ বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য রাশিয়াকে অর্থ দিতে হয়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের জন্য এটি প্রথম অভিজ্ঞতা হওয়ায় নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ এই চুক্তির প্রাণভোমরা। জ্বালানি সরবরাহের জন্য ভারত আলাদা চুক্তি করে থাকে, যা তাদের মূল প্রজেক্টের বাজেটে দেখা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই ৩ বছরের জ্বালানি মূল্য ধরা আছে।
একনজরে খরচের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| দেশ | প্রকল্পের নাম | ক্ষমতা (মেগাওয়াট) | আনুমানিক খরচ (বিলিয়ন ডলার) | রিঅ্যাক্টর টাইপ |
| বাংলাদেশ | রূপপুর | ২৪০০ | ১২.৬৫ | VVER-1200 (Gen 3+) |
| হাঙ্গেরি | প্যাকস ২ | ২৪০০ | ১৩-১৫ | VVER-1200 |
| মিশর | এল-দাবা | ৪৮০০ | ২৮ | VVER-1200 |
| তুরস্ক | আকুয়ু | ৪৮০০ | ২০ | VVER-1200 |
| ভারত | কুদানকুলাম (Phase 2) | ২০০০ | ৬.১২ | VVER-1000 |
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রোসাটামের অন্যান্য প্রকল্প
রূপপুরের খরচ কি সত্যিই বেশি? আসুন সমসাময়িক সময়ে রোসাটাম বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেসব প্ল্যান্ট বানাচ্ছে তার সাথে তুলনা করি:
- হাঙ্গেরি (Paks II): রূপপুরের সমান ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রের খরচ ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার।
- মিশর (El-Dabaa): ৪৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ বিলিয়ন ডলার।
- তুরস্ক (Akkuyu NPP): ৪৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রজেক্টের খরচ ২০ বিলিয়ন ডলার।
দেখা যাচ্ছে, মেগাওয়াট প্রতি খরচের হিসেবে রূপপুর বিশ্বের সমসাময়িক যেকোনো প্রকল্পের চেয়ে সাশ্রয়ী অথবা সমপর্যায়ের। ভারতের কুদানকুলামের পরবর্তী ধাপের (Phase 2) ২০০০ মেগাওয়াট উৎপাদনেই খরচ হচ্ছে ৬.১২ বিলিয়ন ডলার, যা এক দশক আগের খরচের প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে খরচ বাড়াটাই স্বাভাবিক।
লোন পরিশোধের স্বস্তি ও গ্রেস পিরিয়ড
আর্থিক স্থিতিশীলতার দিক থেকেও রূপপুর চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক। রাশিয়ার ঋণের ওপর সুদের হার ৪%, যা দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের জন্য সহনীয়। সবচেয়ে সুবিধাজনক বিষয় হলো, ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড। অর্থাৎ কাজ শুরুর প্রথম ১০ বছর বাংলাদেশকে কোনো কিস্তি দিতে হচ্ছে না। পরবর্তী ২০ বছরে এই লোন পরিশোধ করার সুযোগ রয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা মাত্র ১৪ বছর, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি চাপের।
রাজনৈতিক ইতিহাস ও বিদ্যুতের চালচিত্র
তারেক রহমান যখন রূপপুরের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তখন জনমনে উঁকি দিচ্ছে ২০০১-২০০৬ মেয়াদের বিদ্যুৎ খাতের চিত্র। সেই সময় দেশে ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি বলে তথ্য রয়েছে। বরং ‘বিদ্যুৎ নাই, খাম্বা আছে’—এই অপবাদ এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রচলিত। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবের কারণে সেই সময় অনেক তথ্য গোপন করা সম্ভব হলেও, ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল যুগে প্রতিটি তথ্য এখন জনগণের হাতের মুঠোয়। মিথ্যাচার বা উপাত্তহীন অভিযোগ দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এখন প্রায় অসম্ভব।
চ্যালেঞ্জ: মিথ্যাচার বনাম পারফরম্যান্স
তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল অভিযোগ না তুলে বর্তমান খরচের চেয়ে কমে সমমানের কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি করে দেখানোর সাহস কি তাদের আছে? তথ্য ও উপাত্ত বলছে, রূপপুর কেবল একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এটি আগামী ৬০-৮০ বছরের জ্বালানি নিশ্চয়তা। অহেতুক ব্যয় বাড়ার গুজব ছড়িয়ে এই জাতীয় অর্জনকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
উপসংহার
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচ কেবল ইটের দালান বা লোহার কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত বিনিয়োগ। রূপপুর প্রকল্পে ব্যয়কৃত প্রতিটি পয়সা উন্নত প্রযুক্তির নিরাপত্তা এবং জ্বালানি স্বাধীনতার জন্য ব্যয় হচ্ছে। তারেক রহমানের মতো রাজনৈতিক নেতাদের উচিত আবেগ বা অনুমাননির্ভর বক্তব্যের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক গঠনমূলক সমালোচনা করা। বাংলাদেশের জনগণ এখন শিক্ষিত এবং সচেতন, তারা তথ্যের ব্যবচ্ছেদ করতে জানে। তাই মিথ্যাচারের জবাব এখন সাথে সাথেই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জনগণের সামনে চলে আসছে।
