বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে দুই মাসে ৫৫ হাজার আক্রান্ত ও ৪৫১ শিশুর মৃত্যু। নিউমোনিয়া ও অপুষ্টি বাড়াচ্ছে ঝুঁকি।
বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার, দুই মাসে ৪৫১ শিশুর মৃত্যু
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত আড়াই দশকের সব রেকর্ড ভেঙে মাত্র দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দেশে মোট ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া, অপুষ্টি এবং টিকা না পাওয়াই মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই মাসে রেকর্ডসংখ্যক আক্রান্ত
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১১১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং আরও এক হাজার ১৯২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ জনে। তাদের মধ্যে সাত হাজার ৪২১ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে।
এর আগে দেশে সর্বোচ্চ হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে, যার সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। অথচ গত বছর এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২। ফলে চলমান পরিস্থিতিকে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশুমৃত্যুর পেছনে নিউমোনিয়া ও অপুষ্টি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৫ থেকে ৮ শতাংশ হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তাদের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, মৃত শিশুদের একটি বড় অংশই তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। এছাড়া মায়েদের পুষ্টিহীনতার প্রভাবও শিশুদের স্বাস্থ্যে পড়ছে।
তিনি বলেন, “হামের পরবর্তী জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ হচ্ছে। দ্রুত চিকিৎসা ও টিকাদানই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
টিকা পাওয়ার আগেই মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের বড় অংশই টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছে।
তিন থেকে আট মাস বয়সী ২৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের নিয়মিত টিকা গ্রহণের সময়ই হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে সরকার হামের টিকা দেওয়ার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের শিশুদের দ্রুত হাম-রুবেলা টিকা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু
হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এখানে মারা গেছে ১৫০ জন শিশু।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ৭৮।
গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ৪২২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। অন্যদিকে রংপুর বিভাগে ভর্তি হয়েছে মাত্র সাতজন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে বাড়ছে চাপ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মমেক) হামে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে,
গত দুই মাসে সেখানে মোট এক হাজার ৩৪০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এক হাজার ২০৩ জন এবং মারা গেছে ৩৩ শিশু।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ মৃত্যুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হার্ট ফেইলিউর জটিলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের জরুরি সুপারিশ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গণটিকাদান কর্মসূচি, প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে “ফিভার কর্নার” চালু এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করা এবং শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
