দীর্ঘ কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হলেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তাঁর দেওভোগের বাসার সামনে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নজরদারি করছে পুলিশ।
দীর্ঘ কারাভোগের পর অবশেষে আদালত থেকে জামিন পেয়ে নিজ বাসভবনে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) টানা তিনবারের সাবেক মেয়র ও প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের পৈত্রিক নিবাসে পৌঁছান। তবে তাঁর এই ঘরে ফেরার পরপরই জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর বাসভবনের মূল ফটকের সামনে আধুনিক ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন করাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ও বাদানুবাদ শুরু হয়েছে।
কারামুক্তির পর সাবেক এই মেয়রের বাড়িতে শুভাকাঙ্ক্ষী ও নেতাকর্মীদের ঢল নামলেও পুলিশের এই কড়া নজরদারি এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
দেওভোগের পৈত্রিক নিবাসে কড়া পুলিশি নজরদারি
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বাড়িতে পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে দেওভোগ এলাকার ল্যাম্পপোস্টে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অত্যাধুনিক সিসি ক্যামেরা বসানো হয়।
সাবেক একজন জনপ্রতিনিধির বাড়ির ঠিক সামনে এভাবে ক্যামেরা বসিয়ে নজরদারি করার বিষয়টি সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের নজর এড়ায়নি।
তবে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সহকারী (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন,
এই সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পদক্ষেপটি কেবল সাবেক মেয়রের বাড়িকে উদ্দেশ্য করে নেওয়া হয়নি।
মূলত নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন স্পটে কিশোর গ্যাং বা উঠতি অপরাধী চক্রের অপতৎপরতা দমন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ।
দেওভোগের ওই এলাকায় সর্বমোট চারটি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে যার মধ্যে একটি সাবেক মেয়রের গেটের সামনে পড়েছে।
পুলিশ প্রশাসনের অবস্থান ও হুঁশিয়ারি:
পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে,
সাবেক মেয়রের সাথে তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষ দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবেন, এতে কোনো বাধা নেই।
তবে তিনি ঘরের বা বাইরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম, সাংগঠনিক সভা বা জমায়েত করছেন কিনা, সেটি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ বা ইঙ্গিত পাওয়া গেলে প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
কারামুক্তির প্রথম দিন: আবেগ ও পারিবারিক শোকের আবহ
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দেওভোগের বাড়িতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সদ্য কারামুক্ত আইভীকে দেখার জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, সাবেক কাউন্সিলর ও সাধারণ মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন।
বিকেলে তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন সাবেক নারী কাউন্সিলর মিনুয়ারা বেগম, শাওন অংকন, সাদিয়া সাউদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক কাউন্সিলর অলিউর রহমানসহ মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী।
কারাগারে যাওয়ার ঠিক কিছুদিন আগেই আইভী তাঁর ছোট ভাই আহম্মদ আলী রেজা রিপনকে হারিয়েছিলেন।
স্বজন ও সহকর্মীদের কাছে পেয়ে ভাইয়ের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সাক্ষাতকার ও কথাবর্তার মাঝে ডা. আইভী জানান,
দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার কারণে অনেক ধর্মীয় আমল করার সুযোগ পেয়েছেন যা স্বাভাবিক ব্যস্ত জীবনে হয়ে উঠতো না।
ঘটনাচক্রে, তাঁর মুক্তির দিনটিতেই পারিবারিক খানকায় ‘গাদিরে খুম’ দিবসের ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণে বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন চলছিল।
তরিকতপন্থীদের এই বিশেষ আয়োজনের দিনে ঘরে ফিরতে পেরে তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
গ্রেপ্তারের পটভূমি এবং ১২টি মামলার আইনি লড়াই
গত বছরের ৯ মে ভোরের আলো ফোটার আগেই দেওভোগের নিজ বাসভবন থেকে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া সহিংসতা, হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের অধীনে দায়ের হওয়া মোট ১২টি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ আইনি লড়াই।
উচ্চ আদালতের জামিন প্রক্রিয়া:
১. ১০ মে: বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ১০টি মামলায় হাইকোর্ট আইভীকে জামিন প্রদান করেন, যা পরবর্তীতে আপিল বিভাগেও বহাল থাকে।
২. ৩০ এপ্রিল: সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অবশিষ্ট দুটি মামলায় হাইকোর্ট রুল জারি করে তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন।
৩. ১৭ মে: রাষ্ট্রপক্ষ এই জামিন স্থগিতের আবেদন করলে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত ‘নো অর্ডার’ দেন, যার ফলে আইভীর জামিন পুরোপুরি কার্যকর হয়।
আইনি সমস্ত নথিপত্র ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ করে কারা কর্তৃপক্ষ অবশেষে তাঁকে মুক্তি দিলে তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌঁছান।
উল্লেখ্য, ২০০৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে নবগঠিত সিটি করপোরেশনের টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে প্রায় দুই দশক নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতি ও উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন ডা. আইভী।
রাজনৈতিক দেউলিয়া নাকি প্রশাসনিক সতর্কতা? তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক
সাবেক মেয়রের বাড়ির সামনে সিসি ক্যামেরা বসানো এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দেশের একটি বড় রাজনৈতিক অংশের দাবি, একজন জনপ্রিয় নেত্রীকে কারামুক্তির পরও এভাবে অবরুদ্ধ ও নজরদারিতে রাখার চেষ্টা বর্তমান তারেক সরকারের রাজনৈতিক দুর্বলতা ও এক ধরণের ভীতিকেই প্রদর্শন করে।
সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েই প্রশাসনকে এভাবে ব্যবহার করে কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বোদ্ধারা দেশের অতীত ইতিহাসের উদাহরণ টেনে আনছেন।
তাদের মতে, অতীতে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বা ইয়াহিয়াহ সরকার, ১৯৭৫ সালের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়কাল কিংবা ২০০৮ সালের ১/১১-এর তত্ত্ববধায়ক সরকার—কোনো পক্ষই এদেশের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও গণজাগরণকে বাহুবল বা নজরদারি দিয়ে দাবিয়ে রাখতে পারেনি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটেও তৃণমূলের রাজনৈতিক শক্তিকে এভাবে স্তব্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন দলের কর্মী-সমর্থকরা।
কোন দিকে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি?
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কারামুক্তি এবং তাঁর ওপর পুলিশের এই বিশেষ নজরদারি আগামী দিনগুলোতে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে আইভী সবসময়ই নারায়ণগঞ্জের চুনকা পরিবারের ঐতিহ্য এবং নিজস্ব বলয় নিয়ে রাজনীতি করেছেন।
এখন প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের মুখে তিনি কীভাবে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও জনসম্পৃক্ততা বজায় রাখেন, সেটাই দেখার বিষয়।
তবে আপাতদৃষ্টিতে, দেওভোগের বাড়ির সামনের সিসি ক্যামেরাটি কেবল একটি যন্ত্র নয়,
বরং তা বর্তমান বাংলাদেশের জটিল ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক সমীকরণের এক জ্বলন্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
