দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল পুনঃখননের নামে নিম্নআয়ের মানুষের আবাসন ও মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ। টেকসই উন্নয়ন বনাম উচ্ছেদ নীতির এক বিশেষ প্রতিবেদন।
উন্নয়ন ও জনকল্যাণের নামে গৃহহীন মানুষের মাথার ওপরের ছাদ কেড়ে নেওয়ার এক নির্মম বাস্তবতা তৈরি হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় ‘খাল পুনঃখনন ও জলাশয় সংস্কার’ কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই পরিবেশগত ও পরিকাঠামো উন্নয়নের আড়ালে আসলে এক ধরনের ‘উচ্ছেদের রাজনীতি’ চরিতার্থ করা হচ্ছে। যে মানুষগুলো বছরের পর বছর ধরে মাথা গোঁজার একটা স্থায়ী ঠিকানা পেয়েছিল, আজ প্রশাসনের বুলডোজারের নিচে তাদের সেই স্বপ্ন ও নিরাপত্তা ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা না রেখে এভাবে হাজার হাজার পরিবারকে নতুন করে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া নিয়ে এখন তীব্র ক্ষোভ ও মানবিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আশ্রয়হীনের ঠিকানা আজ প্রশ্নের মুখে: অতীত উদ্যোগের অপমৃত্যু
ফিরে তাকালে দেখা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার শাসননামলে দেশের ভূমিহীন, গৃহহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার রক্ষায় বিশাল আবাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। ‘আশ্রয়ণ’সহ বিভিন্ন সরকারি পুনর্বাসন উদ্যোগের মাধ্যমে লাখ লাখ পরিবারকে জমিসহ পাকা ঘর উপহার দেওয়া হয়েছিল, যা তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা নিশ্চিত করেছিল।
আজ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, সেই মানবিক উদ্যোগগুলোই গভীর সংকটের মুখে পড়েছে।
খাল খনন কিংবা সরকারি জমি উদ্ধারের আইনি অজুহাত তুলে এই ঘরগুলোর একটি বড় অংশ ভেঙে ফেলা হচ্ছে অথবা উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা পূর্ববর্তী সরকারের সাফল্যকে ম্লান করার মানসিকতা থেকে যদি এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়ে থাকে,
তবে তা দেশের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর ওপর এক চরম অন্যায়।
উন্নয়ন বনাম অধিকার: টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞা কী?
কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে, মানুষের মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত রাখে।
কিন্তু বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের যে ধারা দেখা যাচ্ছে, তা নিম্নআয়ের মানুষের আবাসন সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
পরিবেশ রক্ষা বা পানিবদ্ধতা দূরীকরণে খাল খনন অবশ্যই জরুরি,
কিন্তু তার খেসারত কেন কেবল সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষকে দিতে হবে—সেই প্রশ্ন এখন সুধী সমাজের।
মানুষকে গৃহহীন করে, তাদের জীবিকা ও বসবাসের অধিকার কেড়ে নিয়ে যে পরিকাঠামো গড়ে ওঠে, তা কখনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের উদাহরণ হতে পারে না।
পরিবারের আর্তনাদ: ভাঙা ঘরের নিচে চাপা পড়া স্বপ্ন
উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হওয়া একাধিক পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়,
আকস্মিক এই উচ্ছেদের কারণে তারা সম্পূর্ণ দিশেহারা।
অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বল বিক্রি করে এই ঘরগুলোকে থাকার উপযোগী করে তুলেছিল।
“আমাদের বলা হয়েছিল এটা আমাদের স্থায়ী ঠিকানা। শেখ হাসিনার দেওয়া এই ঘরে আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম। কিন্তু এখন খাল কাটার নাম করে আমাদের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখন ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব, কোথায় ঘুমাব, তার কোনো উত্তর প্রশাসনের কাছে নেই।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকল্প কোনো বাসস্থানের ব্যবস্থা না করেই এভাবে উচ্ছেদ করার ফলে হাজার হাজার শিশু, বৃদ্ধ ও নারী খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এর ফলে জননিরাপত্তা যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি মানবিক বিপর্যয়ও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
ইতিহাসের কাঠগড়ায় বর্তমান প্রশাসন
জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
পূর্ববর্তী সরকারের সময় নেওয়া ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন ও আবাসন উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের একটি অবিচ্ছেদ্য দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে রাজনৈতিক ফায়দা বা খামখেয়ালিপনার মাধ্যমে আজ অনেক পরিবারকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
উন্নয়নের নামে যদি মানুষের ঘর ভাঙার এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ইতিহাস কখনোই বর্তমান নীতিনির্ধারকদের ক্ষমা করবে না।
ক্ষমতার পালাবদলে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হওয়া জরুরি।
সুপারিশ ও বর্তমান করণীয়
এই অমানবিক উচ্ছেদের রাজনীতি বন্ধ করতে এবং উন্নয়নকে জনবান্ধব করতে অবিলম্বে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
- পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ: যেকোনো উচ্ছেদ বা সংস্কার কাজের আগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেকটি পরিবারকে সমমানের স্থায়ী আবাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
- যৌক্তিক সীমানা নির্ধারণ: খালের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতীতের সকল মানবিক পরিকাঠামো ও জনবসতিকে বিবেচনায় নিয়ে প্রকৌশলগত বিকল্প বা নকশায় পরিবর্তন আনা।
- ধারাবাহিকতা রক্ষা: রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে গৃহহীনদের জন্য গৃহীত বিগত সরকারের সকল কল্যাণমুখী প্রকল্পের সুরক্ষা ও উন্নয়ন বজায় রাখা।
পরিশেষে, খাল খনন বা জলাশয় উদ্ধার প্রকল্প যেন কোনোভাবেই নিম্নআয়ের মানুষের কান্নার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারকে মনে রাখতে হবে,
সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে তৈরি হওয়া তথাকথিত উন্নয়নের চড়া মূল্য শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দিতে হয়।
উচ্ছেদের এই রাজনীতি বন্ধ করে অবিলম্বে গৃহহীনদের পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচয়।
