চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক হত্যায় পাঁচ অস্ত্রধারী শনাক্ত করেছে পুলিশ। সবাই বিএনপির সঙ্গে ‘সম্পৃক্ত’ এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
রাউজানে যুবদল নেতা হত্যায় ৫ অস্ত্রধারী শনাক্ত, গ্রেপ্তার নেই
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত পাঁচ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তবে ঘটনার দুই দিনেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাম প্রকাশ করা না হলেও স্থানীয়ভাবে তাদের পরিচয় নিয়ে নানা তথ্য সামনে এসেছে।
প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা
গত শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, একদল অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন তিনি এবং পরে তার মৃত্যু হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে পাঁচ অস্ত্রধারী
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে পাঁচজন অস্ত্রধারীকে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে শটগান ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন কদলপুর এলাকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে দামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম ওরফে দিদার, রাউজান পৌরসভার ফরেস্ট অফিস এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফ, পূর্ব রাউজানের মোহাম্মদ জাহেদ এবং মোহাম্মদ আবছার।
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রথমে ইলিয়াস ও দিদার মাকসুদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এরপর ইউসুফ, জাহেদ ও আবছার ঘটনাস্থলে গিয়ে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়।
রায়হান বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী রায়হান বাহিনীর সদস্য। রায়হানকে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাবশালী সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পুলিশের তথ্যমতে, রায়হানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১২টি হত্যাসহ মোট ২৪টি মামলা রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী দামা ইলিয়াসের বিরুদ্ধে রয়েছে পাঁচটি হত্যাসহ ১৮টি মামলা। এছাড়া ইউসুফ, দিদার, জাহেদ ও আবছারের বিরুদ্ধেও একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে।
বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার আলোচনা
হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি। স্থানীয়রা দাবি করছেন, রায়হান বাহিনীর সদস্যদের অনেকেই বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
তবে বিএনপি নেতারা এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম বলেছেন,
সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
অন্যদিকে রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেছেন, অপরাধী যে দলেরই হোক,
তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
পাহাড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাউজানের পূর্বাঞ্চলীয় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা গড়ে উঠেছে।
বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনের পর তারা ওইসব পাহাড়ে গিয়ে আত্মগোপন করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন, মাকসুদুল হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অস্ত্রধারীরাও ঘটনার পর পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে।
ফলে তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ?
হত্যার পেছনে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন এবং বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, নিহত মাকসুদুল হক চম্পাতলী ঘাট এবং খেলার ঘাট এলাকার কয়েকটি বালুমহালের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
এসব বালুমহালকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছিল।
তবে পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যার কারণ নিশ্চিত করেনি। তদন্তের অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক স্বার্থ,
রাজনৈতিক বিরোধ এবং ব্যক্তিগত শত্রুতাসহ সব সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিবারের দাবি: দ্রুত বিচার চাই
নিহত মাকসুদুল হকের বড় ভাই ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বলেন, তাদের পরিবারের সঙ্গে কারও
ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। তিনি সিসিটিভিতে দেখা ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানান।
রোববার বিকেলে চম্পাতলী ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় হাজারো মানুষ অংশ নেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা সেখানে বক্তব্য দিয়ে হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
পুলিশের বক্তব্য
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন,
অস্ত্র হাতে দেখা যাওয়া পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
