সংসদে নিজেকে শহীদের সন্তান দাবি করেন জামায়াতে ইসলামীর এমপি আব্দুল মুনতাকিম। পরে জানা যায়, তার বাবা জীবিত। তিনি “মিথ্যা বলেছেন”
জীবিত বাবাকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ’ বললেন এমপি, সংসদে মিথ্যা তথ্য কেন?
জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা। সেখানে একজন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) আব্দুল মুনতাকিম মিথ্যা বলেছেন”, “প্রতারণা করেছেন”, “ভুয়া পরিচয় দিয়েছেন । সংসদ সদস্যের প্রতিটি বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় নথির অংশ হিসেবেও বিবেচিত হয়। সেই সংসদেই নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াত সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু পরে জানা গেল, তার বাবা এখনো জীবিত এবং নিজ বাড়িতেই বসবাস করছেন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর জনমনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে—একজন সংসদ সদস্য কীভাবে জীবিত বাবাকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে নিজেকে শহীদের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিলেন?
সংসদে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক
গত ১৪ জুন বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় আব্দুল মুনতাকিম নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ বলে উল্লেখ করেন। বক্তব্যটি সংসদের কার্যবিবরণীর অংশ হওয়ার পর বিষয়টি নজরে আসে বিভিন্ন মহলের।
পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, তার বাবা আব্দুল কাদের সৈয়দী এবং মা মোসলমান বেগম দুজনেই জীবিত। তারা নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ধলাগাছ গ্রামে বসবাস করছেন।
এ তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এটি কি শুধু ‘মুখ ফসকে বলা’?
সমালোচকদের প্রশ্ন, একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এমন ভুলকে অসাবধানতা বলা যেতে পারে। কিন্তু একজন সংসদ সদস্য, যিনি প্রস্তুত বক্তব্য নিয়ে জাতীয় সংসদে কথা বলেন, তার মুখ থেকে এমন তথ্য কীভাবে এল?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ পরিচয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সম্মানজনক একটি পরিচয়। এমন একটি পরিচয় ব্যবহার করার আগে ন্যূনতম সতর্কতা কি প্রত্যাশিত ছিল না?
ভুল স্বীকার, কিন্তু প্রশ্নের শেষ কোথায়?
বিতর্কের মুখে আব্দুল মুনতাকিম দাবি করেছেন, তিনি অসাবধানতাবশত ভুল শব্দ ব্যবহার করেছেন। এ জন্য তিনি দুঃখও প্রকাশ করেছেন।
তবে প্রশ্ন উঠছে, শুধু দুঃখ প্রকাশ কি যথেষ্ট? সংসদে প্রদত্ত ভুল তথ্য কি আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধন করা হবে? সংসদের কার্যবিবরণীতে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা সংশোধনী যুক্ত হবে কি না, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
জন্মসালও তৈরি করছে নতুন প্রশ্ন
নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী আব্দুল মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় এক দশক পরে তার জন্ম।
ফলে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ পরিচয় দেওয়ার ঘটনাটি আরও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই এ ধরনের বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব আরও বেশি
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি। তাদের বক্তব্যকে সাধারণ মানুষ নির্ভরযোগ্য তথ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
সে কারণে সংসদে দেওয়া প্রতিটি বক্তব্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও তথ্যগত নির্ভুলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জীবিত বাবাকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ’ বলে উল্লেখ করার ঘটনাটি শুধু একটি বক্তব্যগত ভুল নাকি আরও গভীর কোনো প্রশ্নের
জন্ম দেয়—সেটি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে,
জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তথ্যগত ভুল শুধু ব্যক্তিগত বিব্রতকর পরিস্থিতিই তৈরি করে না, বরং জনআস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
