ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বিদেশে চিকিৎসায় সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৮২ লাখ টাকা নিয়েছেন। কারা কত নিয়েছেন, কী বলছে টিআইবি—বিস্তারিত।
বিদেশে চিকিৎসায় ৮২ লাখ টাকা বিল নিলেন ধর্ম উপদেষ্টা খালিদ, আলোচনায় উপদেষ্টাদের চিকিৎসা ব্যয়
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বিদেশে চিকিৎসা বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা গ্রহণ করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে এটিই বিদেশে চিকিৎসা বাবদ সর্বোচ্চ ব্যয়।
জানা গেছে, হৃদরোগজনিত জটিলতার চিকিৎসার জন্য সরকারি অনুমোদন নিয়ে তিনি দুই দফায় থাইল্যান্ডে যান। সেখানে অস্ত্রোপচারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন করেন। প্রথম সফরে তার সঙ্গে একজন চিকিৎসক এবং দ্বিতীয় সফরে তার মেয়ে ও জামাতা ছিলেন।
চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়ে কী বললেন খালিদ হোসেন?
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে খালিদ হোসেন বলেন, তার শারীরিক জটিলতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তবে চিকিৎসার ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় বর্তমানে পুনরায় বিদেশে যেতে পারছেন না।
তিনি আরও বলেন, দেশে যদি আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সুবিধা থাকত, তাহলে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। তার ভাষায়,
“এটা কোনো প্রমোদ ভ্রমণ নয়। দেশে চিকিৎসা থাকলে কেউ বিদেশে যেত না।”
তিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, বহু বছরেও দেশ আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারেনি, যদিও বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় ও অপচয়ের নজির রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কেন পরিবর্তন হয়নি?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়ে কেন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে খালিদ হোসেন বলেন, শুধু ইচ্ছা থাকলেই অনেক কিছু বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।
তার মতে, প্রশাসনিক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিদেশে চিকিৎসা বাবদ কারা কত টাকা নিয়েছেন?
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরকারি অর্থ থেকে নিম্নোক্ত পরিমাণ ব্যয় করেছেন—
- ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন — ৮১,৯১,৪৮৮ টাকা
- ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ — ৭৯,৩৮,২২৯ টাকা
- তৌহিদ হোসেন — ৮,৭০,৭৪৪ টাকা
- মোস্তফা সরয়ার ফারুকী — ৭,১৫,৬৪৯ টাকা
- ফাওজুল কবির খান — ৫,৩৯,৯৩৫ টাকা
- হাসান আরিফ — ২,৬৭,২১৬ টাকা
- ড. এম আমিনুল ইসলাম — ২,৩৫,৭২৯ টাকা
- আলী ইমাম মজুমদার — ১,৭০,১৩৪ টাকা
- ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ — ৬৭,৩৬৭ টাকা
- আদিলুর রহমান খান — ৩১,০৫২ টাকা
- ড. আনিসুজ্জামান — ২১,৮০০ টাকা
- শেখ মইনউদ্দিন — ৪,১৬০ টাকা
এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা খালিদ হোসেনের নামে।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি গুরুতর শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হন। দেশে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় সরকারি অনুমোদন নিয়ে তিন দফা সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
তিনি দাবি করেন, পুরো প্রক্রিয়াই সরকারি নিয়ম অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে বড় বাজেট, তবুও বিদেশমুখী রোগী
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
তারপরও প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামো, নির্ভুল রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির কারণে বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
টিআইবির মন্তব্য: তদন্ত হওয়া উচিত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী
বা প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার ব্যক্তি অসুস্থ হলে সরকার তার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারে। প্রয়োজনে বিদেশেও চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া যায়।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ বিল, ভাউচার ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তার ভাষায়,
যদি বিল-ভাউচার ছাড়া সরকারি অর্থ ছাড় করা হয়ে থাকে, তাহলে অর্থ গ্রহণকারী যেমন দায়ী, তেমনি অর্থ অনুমোদন ও ছাড় প্রদানকারীরাও দায় এড়াতে পারেন না।
তিনি বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায় নিরূপণের আহ্বান জানান।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
সরকারি অর্থে বিদেশে চিকিৎসা নতুন কোনো বিষয় নয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। চিকিৎসা ব্যয়ের অনুমোদন,
বিল-ভাউচার, হাসপাতালের নথি এবং অর্থ ছাড়ের পুরো প্রক্রিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে বিতর্ক অনেকাংশেই কমে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সুশাসনের অন্যতম শর্ত।
