এ বছরই বাংলাদেশে ফিরবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরা, আওয়ামী লীগ ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তিনি।
এ বছরই দেশে ফিরব, ঘোষণা শেখ হাসিনার; এনডিটিভিকে সাক্ষাৎকারে নানা বিষয়ে বক্তব্য
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর দেশের বাইরে অবস্থান করার পর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি চলতি বছরেই দেশে ফিরবেন। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-কে দেওয়া এক বিশেষ ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আইনি বাধা কিংবা বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র তাকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। বরং এটি বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
‘ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না’
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি কখনো ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি। তার ভাষায়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তার রাজনৈতিক সংগ্রাম।
তিনি বলেন,
“আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াই আমার লক্ষ্য।”
তার দাবি, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
দেশে ফেরার অঙ্গীকার
শেখ হাসিনা বলেন, নানা রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তিনি এ বছরই বাংলাদেশে ফিরবেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো কঠিন পরিস্থিতি পার করেও তিনি রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে সরে দাঁড়াননি।
তার ভাষায়,
“আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। অতীতেও ভয় পাইনি, এখনও পাই না। সব বাধা অতিক্রম করে আমি আমার মাতৃভূমিতে ফিরব।”
আওয়ামী লীগ নিয়ে যা বললেন
দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং জনগণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি রাজনৈতিক সংগঠন।
তার দাবি, ৭৭ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ বহুবার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের সমর্থনে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, কিছু বাংলাদেশবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে।
তার দাবি, জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা হলেও সাধারণ মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে কর্মসূচি পালন করছেন, যা দলটির পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত বহন করে বলে তিনি মনে করেন।
গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে উদ্বেগ
৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।
তার মতে, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মতো রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং কিছু সাংস্কৃতিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয়েছে।
এসব ঘটনাকে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শের জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার গুঞ্জন নাকচ
সাক্ষাৎকারে বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে গোপন সমঝোতার বিষয়ে চলমান আলোচনাও নাকচ করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন,
“আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া চায় না। গণতন্ত্র এবং ভোটাধিকার কোনো গোপন সমঝোতার বিষয় হতে পারে না।”
তার মতে, জনগণের ভোটাধিকার এবং সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করাই যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
প্রবাসে থাকলেও মন বাংলাদেশে
ভারতে অবস্থান করলেও তার মন সবসময় বাংলাদেশে পড়ে থাকে বলে জানান শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, বাবার সমাধি, দেশের মানুষ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত ভাবেন।
তার ভাষায়,
“আমি শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাব। জনগণই একদিন আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে। তবে তার দেশে ফেরা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কিংবা আইনি প্রক্রিয়া—এসব বিষয় ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিদ্যমান আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক অবস্থান বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা চলতি বছর দেশে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ,
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
তবে তার এই ঘোষণার বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, দেশে ফেরার ক্ষেত্রে কী ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে
এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এর কী প্রভাব পড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
