অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে হওয়া দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ তদন্তে দুদককে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে সংঘটিত সব ধরনের দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সেই সময়ে কোথায়, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে দুর্নীতি হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান হওয়া উচিত। এজন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান তিনি।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
‘১৮ মাসের সবকিছুর তদন্ত হোক’
সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়কাল নানা অস্থিরতায় পরিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে যারা দুর্নীতির হিসাব চাচ্ছেন এবং সরকারের সমালোচনা করছেন, তাদের কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, কারা করেছে—সবকিছু খুঁজে বের করা হোক।”
এ সময় তিনি দুদকের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
টিআইবির প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ
বক্তব্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির মাত্রা সর্বোচ্চ ছিল।
তিনি বলেন, প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট কেউ দায়মুক্তি পাওয়ার সুযোগ নেই।
আওয়ামী লীগ আমলের অর্থনীতিকে ‘লুটপাটের অর্থনীতি’ আখ্যা
সালাহউদ্দিন আহমদ তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৬ বছরের শাসনামলকে “ইকোনমিকস অব প্লান্ডারিং” (লুটপাটের অর্থনীতি) হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার দাবি, ওই সময়ে ব্যাংক খাত, উন্নয়ন প্রকল্প, কর অব্যাহতি এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির মধ্যেই বর্তমান সরকার নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করেছে।
অর্থ পাচার ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রস্তুত হওয়া ‘স্টেট অব দ্য বাংলাদেশ ইকোনমি (২০০৯-২০২৩)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অর্থনীতির সংকটের পেছনে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাব, ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ও লাগামহীন দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ এবং ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের অনিয়মের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বস্তির কথা
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘নিউ ইকোনমিক অর্ডার’ বা নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কোনো নতুন কর আরোপ করা হয়নি।
তিনি জানান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরকে বাজেটের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত মামলা গ্রহণ, আসামি গ্রেপ্তার এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নারীও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা বৃদ্ধির বিষয়টি অপরাধ বৃদ্ধির চেয়ে অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ার ফল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া জুয়া, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
