ইসলামের নাম ব্যবহার করে অনৈতিকতা ও ধোঁকাবাজি করলে তা কস্মিনকালেও ইসলাম হতে পারে না। চরমোনাই পীর মুফতি রেজাউল করীমের এই হুংকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
যুব আন্দোলনের দশকপূর্তি ও বিশাল মহাসমাবেশ
রাজধানীর ঐতিহাসিক বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট চত্বরটি সেদিন পরিণত হয়েছিল তৌহিদী জনতা ও যুবকদের এক বিশাল মিলনমেলায়। উপলক্ষ ছিল ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ-এর দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য ও সুশৃঙ্খল মহাসমাবেশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার নেতাকর্মীর স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও ইসলামী সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে যুবসমাজের মাঝে এক বিপ্লবী ও আত্মিক জাগরণের সৃষ্টি করা হয়।
যুবকদের সুশৃঙ্খল উপস্থিতি এবং দেশের সমসাময়িক সংকট উত্তরণে তাদের জোরালো ভূমিকা পালনের প্রত্যয় ছিল এই আয়োজনের মূল আকর্ষণ।
চরমোনাই পীরের মূল বক্তব্য: নামেই পরিচয় বদলায় না
সমাবেশের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্মানিত আমির মুফতি সৈয়দ
মুহাম্মদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)। তিনি তার স্বভাবসুলভ প্রাঞ্জল ও তেজস্বী ভাষায় দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেন।
তিনি তার বক্তৃতার এক পর্যায়ে অত্যন্ত চমৎকার একটি রূপক ব্যবহার করে বলেন:
“কালো বর্ণের কোনো মানুষের নাম যদি কেউ শখ করে ‘সাদা মিয়া’ রাখে, তবে কি সে রাতারাতি ফর্সা বা সাদা হয়ে যাবে? কস্মিনকালেও না। তেমনিভাবে, কেউ যদি নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য বা অসৎ উদ্দেশ্যে ইসলামের লেবাস গায়ে জড়িয়ে কিংবা ইসলামের নাম ভাঙিয়ে অনৈতিকতা, বিশৃঙ্খলা ও ধোঁকাবাজি চালায়, তবে সেই অপকর্মগুলো কোনোভাবেই ইসলাম হয়ে যাবে না।”
তিনি আরও জোরালোভাবে বলেন যে, যারা ইসলামের সুমহান আদর্শের আড়ালে থেকে বিজাতীয় সংস্কৃতি, দুর্নীতি ও অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে,
তারা মূলত ধর্মের লেবাসে ধর্মেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতিসাধন করছে এবং ইসলামকে কলঙ্কিত করছে।
ভালো নেতা ও নীতির সমন্বয় ছাড়া জাতির মুক্তি অসম্ভব
বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সুশাসন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চরমোনাই পীর উল্লেখ করেন যে,
দেশের সার্বিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য যোগ্য নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন:
নেতৃত্বের সংকট: ভালো নেতা এবং জনকল্যাণমুখী নীতি ছাড়া কোনো জাতি কখনো উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না।
উন্নয়ন ও নিরাপত্তা: রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নীতি নির্ধারকদের নীতি যদি সততা ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়,
তবে দেশের টেকসই উন্নয়ন, জনগণের নিরাপত্তা এবং সুশাসন কেবলই অলীক কল্পনা হয়ে থাকবে।
সমাজ থেকে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং মাদকের বিষবাষ্প চিরতরে দূরকরার একমাত্র অব্যর্থ ওষুধ হলো ইসলামের সুমহান ও শাশ্বত আদর্শের বাস্তবায়ন।
সমাবেশে অন্যান্য বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ঐতিহাসিক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাওলানা অলিউল্লাহ তালুকদার।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন এবং দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক নেসার উদ্দিন হুজাইফা।
বিশেষ অতিথি ও বক্তা হিসেবে মঞ্চ অলংকৃত করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বরেণ্য উলামায়ে কেরাম ও আন্দোলন নেতৃবৃন্দ:
- মাওলানা গাজী আতাউর রহমান (মহাসচিব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ): তিনি যুবসমাজকে নৈতিকতার বুনিয়াদ শক্ত করার আহ্বান জানান।
- প্রিন্সিপাল সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী (প্রেসিডিয়াম সদস্য): তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনে যুবদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দেন।
- আহমাদ আব্দুল কাইয়ুম (সহকারী মহাসচিব): সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
- আতিকুর রহমান মুজাহিদ (কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী): তিনি প্রধান বক্তার বক্তব্যে যুবসমাজকে অধিকার আদায়ে রাজপথে আপসহীন থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান।
- মাওলানা হাম্মাদ বিন মোশাররফ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম (কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক): তারা দেশপ্রেম ও মুক্তির চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন।
- এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন মাওলানা ইলিয়াস হাসান, প্রভাষক মাওলানা আল আমীন, মুফতি আবু বকর সিদ্দীক, মাওলানা আরিফ বিন মেহের উদ্দিন, মুফতি মোস্তাফিজুর রহমান, মুফতী হাফিজুল হক ফাইয়াজ প্রমুখ।

- ছবি ১: বাইতুল মোকাররম চত্বরে ইসলামী যুব আন্দোলনের ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মহাসমাবেশের একটি প্যানোরামিক বা দূর থেকে তোলা বড় জমায়েতের ছবি।
পরিশেষে বলা যায়, ধর্মের লেবাস ধারণ করলেই কেউ ধার্মিক বা সৎ হয়ে যায়না—এই শাশ্বত সত্যটি আজসময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
চরমোনাই পীরের এই হুংকার ও যুব আন্দোলনের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মহাসমাবেশ প্রমাণ করে যে, দেশের তরুণ সমাজ আজ সচেতন
এবং তারা অন্ধ অনুকরণ বা ধোঁকাবাজির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি নৈতিক ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয় গ্রহণ করেছে।
দেশ ও জাতির কল্যাণে এই ধরনের গঠনমূলক বার্তা যুগে যুগে সঠিক পথ দেখাতে সাহায্য করবে।
