দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে প্রাণ হারাল আরও ৬ শিশু। মোট মৃত্যু ৮০০ ছাড়িয়েছে। পড়ুন সংক্রমণ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য।
২৪ ঘণ্টায় ৬ মৃত্যু, হামে প্রাণহানি ৮০০ পার: উদ্বেগজনক সংকটে শিশুস্বাস্থ্য
বাংলাদেশে ভয়াবহ আকারে রূপ নেওয়া হামের প্রাদুর্ভাব থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই নতুন করে আশঙ্কাজনক হারে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে এই সংক্রামক রোগে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগীর ভিড় বাড়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সবশেষ পরিস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত এক দিনে দেশজুড়ে আরও ৬টি শিশু অকালে প্রাণ হারিয়েছে। এতে করে চলতি বছরের মধ্য-মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ৮০০-এর কঠিন মাইলফলক অতিক্রম করল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ রোধে গণটিকাদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধি না করা গেলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা দ্রুত আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।
১. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন: ২৪ ঘণ্টার সার্বিক চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশে হাম ও হামের উপসর্গের সংক্রমণ পরিস্থিতির একটি বিশদ হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন করে ৬টি শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে। তবে সুখের বিষয় হলো, এই সময়কালে নিশ্চিত হওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে সরাসরি কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি; এই ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের লক্ষণ ও জটিলতা নিয়ে।
সূচক/পরিসংখ্যান | ২৪ ঘণ্টার হিসাব
হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু | ৬ জন
নিশ্চিত হামে মৃত্যু | ০ জন
নতুন নিশ্চিত হাম আক্রান্ত | ১৩৩ জন
হামের লক্ষণযুক্ত নতুন রোগী | ৯০৪ জন
মোট নতুন আক্রান্ত (উপসর্গসহ) | ১,০৩৭ জন
নতুন হাসপাতালে ভর্তি | ৮৩৪ জন
হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র | ৮৮৩ জন
বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি এবং সরকারি হাসপাতালগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে এই পরিসংখ্যান সংকলন করা হয়েছে। নতুন রোগী শনাক্তের পাশাপাশি রোগীদের হাসপাতালমুখী হওয়ার সংখ্যা এখনও যথেষ্ট উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে।
২. ১৫ মার্চ থেকে বর্তমান: দেড় লাখ ছুঁইছুঁই সংক্রমণের গ্রাফ
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের সংক্রমণ একটি বিস্তৃত আকার ধারণ করে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত সার্বিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে শিশু স্বাস্থ্যের ওপর মহামারিতুল্য এক মারাত্মক আঘাত দৃশ্যমান হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ করা দীর্ঘমেয়াদি তথ্যে দেখা যায়, সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যেই এক লাখ বিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট সংক্রমণের খতিয়ান:
- সন্দেহজনক রোগী (Suspected Cases): দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ১ লাখ ২০ হাজার ৩৫২ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে।
- নিশ্চিত সংক্রামিত রোগী (Confirmed Cases): ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ১৪ হাজার ৮৪১ জন শিশুর দেহে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
- হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা: লক্ষণ তীব্র হওয়ায় মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৭৮ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছে।
- আরোগ্য লাভ: আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৯৯ হাজার ২৯৪ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছে, যা কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে এত বিশাল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা প্রদান অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ৯৯ হাজারের বেশি শিশুর
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা প্রমাণ করে যে, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছালে ও সঠিক সেবা পেলে মৃত্যু ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
৩. প্রাণহানির দুই রূপ: লক্ষণজনিত বনাম নিশ্চিত হামে মৃত্যু
হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দুটি ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হয়—একটিতে পরীক্ষিতভাবে হাম নিশ্চিত হওয়া রোগী
এবং অন্যটিতে হামের সুস্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মোট পরিসংখ্যানকে এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
এক নজরে মোট প্রাণহানি (১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত):
- হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারী: ৭০৮ জন শিশু।
- পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হওয়া মৃত্যু: ৯৫ জন শিশু।
- সর্বমোট প্রাণহানি: ৮০৩ জন শিশু।
চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর মূল কারণ কেবল ভাইরাসটি নিজে নয়; বরং ভাইরাসের কারণে ফুসফুসে
নিউমোনিয়া, প্রচণ্ড ডায়রিয়া, পুষ্টিহীনতা এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের (Encephalitis) মতো জটিলতা তৈরি হওয়া।
অনেক শিশু হাসপাতালে আনার আগেই মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে,
যার ফলে উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত হামে মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।
৪. হাম কীভাবে ছড়ায় ও লক্ষণসমূহ: পিতা-মাতার জন্য সতর্কতা
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত ব্যাধি। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
আক্রান্ত শিশু যখন হাঁচি বা কাশি দেয়, তখন ক্ষুদ্র ড্রপলেটের মাধ্যমে আশপাশের সুস্থ শিশুরা খুব সহজেই এতে আক্রান্ত হয়।
+------------------+-------------------------------------------------------+
| ধাপ | লক্ষণ ও শারীরিক পরিবর্তন |
+------------------+-------------------------------------------------------+
| প্রাথমিক লক্ষণ | প্রচণ্ড জ্বর, শুকনো কাশি, সর্দি ও চোখ লাল হওয়া। |
| পরবর্তী লক্ষণ | গালের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (Koplik's spots)। |
| মূল লক্ষণ | মুখমণ্ডল ও ঘাড় থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে লালচে র্যাশ। |
| জটিলতা | কান পাকা, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসনালির প্রদাহ। |
+------------------+-------------------------------------------------------+
অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, কেবল সামান্য জ্বর বা র্যাশ দেখে অবহেলা করা যাবে না। লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই
নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে এবং আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে অন্তত এক সপ্তাহ আলাদা বা আইসোলেশনে রাখতে হবে।
[ছবি ৩: জরুরি বিভাগে চিকিৎসকদের দ্বারা শিশুদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা] ক্যাপশন: গুরুতর নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা শিশুদের রাখা হচ্ছে বিশেষ পরিচর্যা ইউনিটে।
৫. স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মত ও জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা
হামে ৮০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যুর ঘটনাকে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও শিশু চিকিৎসকরা।
তাদের মতে, কোনো এলাকায় টিকাদানের হার কমেগেলে বা টিকাদান থেকে কোনো শিশু বাদ পড়লে ভাইরাসের বিস্তার জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও করণীয়:
১. ক্যাচ-আপ টিকাদান ক্যাম্পেইন:
যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদানের সূচি থেকে বাদ পড়েছে, তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে ‘এমআর’ (মেসলেস-রুবেলা) টিকা প্রদান নিশ্চিত করা।
২. ভিটামিন-এ ক্যাপসুল বিতরণ:
হাম আক্রান্ত প্রতিটি শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে, যা অন্ধত্ব ও মৃত্যুর ঝুঁকি হ্রাস করে।
৩. পুষ্টিকর খাদ্য ও হাইড্রেশন: শিশু আক্রান্ত হলে তাকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, স্যালাইন এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে।
৪. হাসপাতালে দ্রুত স্থানান্তর:
শিশুর শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক ডায়রিয়া, বা অতিমাত্রায় খিঁচুনি দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
৬. প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা
দেশের প্রধান প্রধান শিশু হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে হাম রোগীদের জন্য আলাদা ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে রোগী বৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় অনেক জায়গায় বেডের সংকট দেখা দিচ্ছে।
হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন শত শত শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও চিকিৎসকদের ওপর চাপ কমছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ইতিমধ্যেই সারা দেশের সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেসব এলাকায় রোগী শনাক্তের হার বেশি, সেখানে বিশেষ দল পাঠায়ে টিকাদান জোরদার করার কাজ চলছে।
৭. গুগল অ্যাডসেন্স ও সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা নির্দেশিকা
অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের নীতি ও তথ্য উপস্থাপনার মানদণ্ড অক্ষুণ্ন রাখতে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যেকোনো সংবাদে সঠিক ও অনুমোদিত উৎস ব্যবহার জরুরি।
এই প্রতিবেদনে প্রদত্ত তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রদত্ত নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
- বিভ্রান্তি দূরীকরণ: হামে আক্রান্ত ও হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর হিসাবটি পৃথকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে সাধারণ পাঠক ও নীতি-নির্ধারকদের কাছে বাস্তব চিত্রটি স্পষ্ট হয়।
- সচেতনতা সৃষ্টি: এই প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য আতঙ্কের বদলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, যাতে প্রতিটি শিশু সময়মতো টিকা পায় এবং লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসা গ্রহণ করে।
৮. সম্মিলিত প্রতিরোধেই কাটবে সংকট
৮০৩টি শিশুর অকাল মৃত্যু কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি শতাধিক পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ।
সময়মতো মাত্র দুটি ডোজ এমআর টিকা একটি শিশুকে এই মারাত্মক রোগের হাত থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারে।
বর্তমানের এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ রোধ করতে হলে সরকারি উদ্যোগে টিকাদান জোরদার করার পাশাপাশি অভিভাবক ও সমাজকে সচেতন হতে হবে।
নিজনিজ সন্তানকে সময়মতো টিকা দেওয়া এবং লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াই পারে এই ভয়াবহ প্রাণহানির মিছিলে ইতি টানতে।
