হরমুজ প্রণালির যুদ্ধক্ষেত্র ও মিসাইল হামলা পেরিয়ে অবশেষে দেশে ফিরলেন ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকেরা। চার মাসের রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা জানালেন ক্যাপ্টেন।
হরমুজ প্রণালির যুদ্ধক্ষেত্র পেরিয়ে দেশে ফিরলেন ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকেরা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে অবশেষে স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে চার মাসের বেশি সময় আটকা পড়া বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিক ও সমুদ্রযোদ্ধারা। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পার করা অনিশ্চিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেলে বিমানযোগে দেশে পৌঁছান তারা।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান হয়ে আসা এই বীর নাবিকেরা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতেই সেখানে নেমে আসে এক অশ্রুসজল এবং আবেগাপ্লুত পরিবেশ। দীর্ঘ অবরুদ্ধ দশার ভয়াবহ স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ক্রু সদস্যরা জানান কীভাবে তাদের চোখের সামনে একের পর এক বিদেশি জাহাজ ধ্বংসে পরিণত হয়েছিল।
‘চোখের সামনে আগুন আর মৃত্যুর মিছিল, পেয়িছি দ্বিতীয় জীবন’
বিমানবন্দরের টার্মিনালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের গা শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি। দীর্ঘ দিন ধরে দেশের প্রতিটি মানুষের দোয়া, সহমর্মিতা এবং প্রশাসনিক তৎপরতাই আমাদের স্বদেশে ফেরার প্রেরণা জুগিয়েছে। আমাদের ওপর দিয়ে যখন একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মারা হচ্ছিল এবং পার্শ্ববর্তী জাহাজগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল, তখনও আমরা মানসিকভাবে শক্ত থাকার চেষ্টা করেছি।”
ক্যাপ্টেন জানান, জেবেল আলী বন্দরে নোঙর করা অবস্থায় একেবারে পাশের বার্থে মিসাইল আঘাত হানে। সেখানে থাকা একটি তেলবাহী ট্যাংকারে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়।
তিনি বলেন, “ছয়-ছয়টি টাগবোট চেষ্টা করেও সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না।
ট্যাংকারের বিশাল রসদ যদি বিস্ফোরিত হতো, তবে আমাদের জাহাজটিও ভস্মীভূত হয়ে যেত।
অনেক নাবিক মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত (ট্রমাটাইজড) হয়ে পড়েছিলেন, অনেকের করুণ মৃত্যুও হয়েছে পানির অভাবে।”
ম্যানুয়াল নেভিগেশন ও রাষ্ট্রীয আমানত রক্ষার দুঃসাহসিক লড়াই
যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে যখন পুরো হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে জিপিএস ও আধুনিক স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা জ্যাম ও
বিকল করে দেওয়া হয়েছিল, তখন জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন জাহাজটির কমান্ডিং অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন।
সংবাদে প্রণয় কৃষ্ণ জানান, স্যাটেলাইট অকার্যকর থাকায় সম্পূর্ণ প্রথাগত ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে দিক নির্ণয় করে অত্যন্ত বিপজ্জনক পথঅতিক্রম করতে হয়েছে।
সমুদ্রের সেই অংশে মাইন পুঁতে রাখা হয়েছিল, ফলে সামান্য এক ইঞ্চি বিচ্যুতিও ডেকে আনতে পারত ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
সরকারি তরফ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে হোটেল বা স্থলে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও কোটি টাকার জাহাজ
অরক্ষিত রেখে যেতে অস্বীকৃতি জানান নাবিকেরা। চার মাসের দীর্ঘ জিম্মিদশায় তারা জাহাজে থেকেই দেশীয় সম্পদ পাহারা দিয়েছেন।
স্বজনদের জড়িয়ে ধরে কান্না ও এক আবেগঘন প্রত্যাবর্তন
চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালি হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
পরবর্তীতে কাতার থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে নোঙর ফেলে।
কিন্তু এর পরদিনই ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে জাহাজটির চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
টানা ১১৫ দিন জিম্মি থাকার পর ২৩ জুন রাতে ইরানি সীমান্তরক্ষীদের অনুমতি নিয়ে প্রণালি অতিক্রম করে জাহাজটি নিরাপদ
আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বদেশের মাটিতে পা রাখতেই বিএসসি (বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন)-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের পুষ্পবৃষ্টিতে বরণ করে নেন।
টার্মিনালের বাইরে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন জিম্মিদশা থেকে মুক্ত নাবিকেরা।
দীর্ঘদিনের আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে সমুদ্রের এই বীর সন্তানদের ঘরে ফেরার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটল এক অদম্য জীবনসংগ্রামের গল্পের।
