দত্যাগের পর সপরিবারে বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশানের নিজ বাসভবনে ফিরে গেছেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও বিস্তারিত জানুন।
বিদায়বেলা এবং গুলশানের পথে গাড়িবহর
রবিবার দুপুরের ঠিক আগমুহূর্তে, বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর ঐতিহাসিক বঙ্গভবনের মূল ফটক দিয়ে বের হয়ে আসে সাবেক রাষ্ট্রপতির সুসজ্জিত গাড়িবহর। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল মেনে বহরে যুক্ত ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ১৮টি সুশৃঙ্খল বাহন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল যেদিন তিনি পরম উদ্দীপনায় বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছিলেন, আজ ব্যক্তিগত নানা জটিলতা ও স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে তার সেই সুদীর্ঘ অধ্যায়ের ইতি ঘটল।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ১২৩ নম্বর সড়কের সুপরিচিত সেই বাসভবনে আজ সপরিবারে উঠলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে এই বাড়িরই একটি ফ্ল্যাটে তার ব্যক্তিগত জীবন কেটেছিল। দীর্ঘ মেয়াদের সুদীর্ঘ প্রটোকল পেছনে ফেলে তিনি আবারও ফিরে গেলেন নিজের একান্ত চেনা সেই ঠিকানায়।
নিরাপত্তার কড়াকড়ি ও মিডিিয়ার কৌতূহল
সাবেক রাষ্ট্রপতির বঙ্গভবন ত্যাগের গুঞ্জন ও নির্ধারিত দিনক্ষণ ঘিরে সকাল থেকেই রাজধানীর গুলশান এবং বঙ্গভবন এলাকা ছিল চরম মাত্রায় সুরক্ষিত। গণমাধ্যমকর্মীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে বঙ্গভবনের মূল প্রবেশদ্বারের বাইরে। পাশাপাশি উৎসুক সাধারণ মানুষের জটলাও এড়িয়ে যাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, গুলশানের ১২৩ নম্বর সড়কের বাসভবনটির চারপাশের নিরাপত্তা বলয় বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সকালের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে দায়িত্বভার গ্রহণ করে পুলিশ, র্যাব এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ভবনটির যে ফ্ল্যাটটিতে তিনি অতীতে বসবাস করতেন, সেটি নতুন করে পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের কাজ শেষে তার বরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।
শারীরিক অসুস্থতা ও সুদীর্ঘ চিকিৎসার প্রস্তুতি
নিজের পদত্যাগপত্রে এবং ঘনিষ্ঠ মহলে সাবেক রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তার এই হঠাৎ বিদায়ের পেছনে কাজ করেছে গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন—
- তীব্র হৃদ্রোগ এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায়
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও কিডনির জটিল কার্যকারিতায়
- সম্প্রতি হৃদ্যন্ত্রে সফল বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক একটি বিরল ও জটিল স্নায়ুরোগ।
চিকিৎসকদের কঠোর পরামর্শ অনুযায়ী, এই বিরল রোগের কারণে যেকোনো মুহূর্তে আকস্মিক সংজ্ঞাহীনতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাকে অতিসত্বর দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়ার তাগাদা দিয়েছেন। খুব শীঘ্রই তিনি জীবন রক্ষার্থে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংককের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করবেন বলে জানা গেছে, যেখানে তার অর্ধাঙ্গিনী রেবেকা সুলতানাও সঙ্গে থাকবেন।
সাংবিধানিক ধারা ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার
মো. সাহাবুদ্দিনের প্রস্থান এবং বঙ্গভবনের শূন্যতা পূরণে দেশের সংবিধানের চতুর্থ ভাগের প্রথম পরিচ্ছেদের ৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী
তাৎক্ষণিক সাংবিধানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপ্রধানের পদ শূন্য হওয়ায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায়
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বঙ্গভবনের যাবতীয় প্রশাসনিক এবং দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড এখন থেকে স্পিকারের কার্যালয়ের নির্দেশনায় পরিচালিত হবে।
একই সঙ্গে সংবিধানের বিধান মোতাবেক আগামী ৯০ দিনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

- ছবি ১: বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় সাবেক রাষ্ট্রপতির গাড়িবহরের একটি দৃশ্য।

- ছবি ২: গুলশানে অবস্থিত সাবেক রাষ্ট্রপতির বাসভবনের সামনে কঠোর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি।
একটি সাংবিধানিক ও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদের বর্ণাঢ্য অধ্যায় পেরিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের নিজগৃহে ফিরে যাওয়া কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়,
এটি দেশের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর একটি নিয়মিত রুটিন প্রক্রিয়া। শারীরিক অসুস্থতাকে প্রাধান্য দিয়ে তার এই স্বেচ্ছাবসাদ
এবং সাংবিধানিক নিয়মে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রতি আস্থারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
