শেখ হাসিনার অবস্থান ও ঢাকার রাজনীতি নিয়ে প্রফেশনাল ডক্টর আরিফ খানের বিশ্লেষণ। ভারত কি সত্যিই দূরত্ব বাড়াচ্ছ? জানুন ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনীতির গভীর খেলা।
ভারতের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে বারবার একটি কথা বলা হচ্ছে। শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলন বা মন্তব্যের সাথে তারা জড়িত নয়। নয়া দিল্লি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয় না। শুরু থেকেই ভারত সরকার এই নীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখানে বড় ধরনের একটি প্রশ্ন দেখা দেয়। যদি কোনো সম্পৃক্ততা না থাকে, তবে এই সংবাদ সম্মেলন কেন হতে দেওয়া হলো?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই বিষয়ে বিশেষ আলোকপাত করেছে। তাদের মতে, ভারত ক্রমান্বয়ে শেখ হাসিনা ইস্যুতে কিছুটা গুটিয়ে আসছে। আগ বাড়িয়ে বললে, দিল্লি শেখ হাসিনাকে কৌশলগত হিসাবের বাইরে রাখতে চাইছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বনাম ব্যক্তি: ‘তিব্বত ও দলাই লামা’ মডেলের পুনরাবৃত্তি?
অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক শুরু থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলছেন। ভারত এখানে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে দেখছে।
এই কৌশল নতুন কিছু নয়। বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিব্বত ও দলাই লামা ইস্যুতে ভারত একই পন্থা অবলম্বন করে আসছে।
দিল্লি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও কূটনীতি রক্ষা করে চলেছে। একই সাথে তারা আশ্রয় নেওয়া প্রভাবশালী নেতাকেও নিজেদের কাছে রাখছে।
ঢাকায় নতুন গুঞ্জন: ডিসেম্বরে প্রত্যাবর্তন ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেলেও ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন খবর বইছে। শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা বা উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে আলোচনা চলছে।
এই খবর প্রকাশ পেতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র চাঞ্চল্য ও হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় দৃশ্যপট বদলে গেছে। বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতকে আর সরাসরি দোষারোপ করতে পারছে না।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সামনে রেখে যে রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা ঢাকার কৌশলগত সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।
‘ডাম্প’ নাকি কৌশলগত প্রশমন: ভূ-রাজনীতির আসল খেলা
আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি শেখ হাসিনাকে সম্পূর্ণ বাদ দিচ্ছে? নাকি দিল্লি এই ইস্যুটিকে পুরোপুরি ‘নিউট্রালাইজ’ বা নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ বেছে নিয়েছে?
শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে ফিরবেন কিনা, তা ভবিষ্যৎ বলবে।
তবে এক কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।
প্রফেসর ডক্টর আরিফ খানের মূল মূল্যায়ন: “ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে কোনো নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে চূড়ান্ত বা নিশ্চিত মনে করা বোকামি। বাংলাদেশ ও ঢাকা মূলত ভারত মহাসাগরীয় এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি অংশমাত্র।”
কৌশলগত ভুল ও আগামী রাজনীতি: মংলা পোর্ট ও শিলিগুড়ি প্রশ্ন
বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি বা অন্য কোনো দল যদি মংলা পোর্ট কিংবা কৌশলগত শিলিগুড়ি করিডরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে হস্তক্ষেপর চেষ্টা চালায়, তবে তা জটিলতা বাড়াবে।
এ ধরনের কৌশলগত জায়গায় হাত না দিলে হয়তো তারা সহজে দেশ পরিচালনা করতে পারত।
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি অনেক বেশি ঘোরালো হয়ে উঠেছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের এই বৃহৎ খেলায় ঢাকাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা ঢাকার জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অধ্যাপক ড. আরিফ খান
সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
