ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার অটল প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। এফসিসি সাউথ আয়োজিত ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান সংকট, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ডাক দিয়ে তিনি বলেন, ভয় কখনো জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব আটকাতে পারে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক যুগান্তকারী ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। এফসিসি সাউথ (FCC South)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, আগামী ডিসেম্বর মাসেই তিনি সব বাধা উপেক্ষা করে তার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসছেন। দেশের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে জীবন বা মৃত্যুর পরোয়া না করে জনগণের অধিকার আদায়ে তিনি পিছপা হবেন না বলে অটল প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছেন।
“ভয় কখনো জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না”
সংবাদ সম্মেলনে নিজের জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা বা শত শত সাজানো মামলা তাকে কখনোই দমাতে পারেনি। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নন, বরং তিনি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“আমার ভাগ্যে যাই থাকুক, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে আসব। আমার প্রিয় দেশবাসী যখন কষ্টে আছে, তখন আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি জানি, আমাকে আটক করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে। সাজানো মামলার রায় কার্যকর করারও চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু ভয় কখনোই জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।”
ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা ও রাজনৈতিক কৌশল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার এই ঘোষণা বর্তমান অবৈধ সরকার এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিরাট ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ দুই বছর প্রবাসে বা দেশের বাইরে থেকেও দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম ও জনগণের দুর্ভোগ তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের শিল্প খাত, অর্থনীতি, ব্যাংকিং সেক্টর এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি দেখে তিনি আর চুপ থাকতে পারেননি। গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক অধিকার পুনরুদ্ধারে ডিসেম্বরের এই প্রত্যাবর্তন হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক টার্নিং পয়েন্ট।
সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও জুলাই-আগস্টের প্রকৃত সত্য উন্মোচন
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা দেশের ক্রান্তিলগ্নে যারা নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে সত্য সংবাদ পরিবেশন করে চলেছেন, সেই সাংবাদিকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। এরপর তিনি ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের ঘটনাবলির পেছনের নেপথ্য চিত্র তুলে ধরে বলেন, এটি কোনো শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। কোটা আন্দোলনকে পুঁজি করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ একটি চক্র সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস, ১৫টির বেশি মিডিয়া হাউজে হামলা এবং লাশ ফেলে সরকার পতনের নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তৎকালীন সময়ে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হলেও
বর্তমান সরকার তা বন্ধ করে খুনিদের ইনডেমনিটি দিয়েছে।
দেশজুড়ে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও বর্তমান করুণ দশা
৫ আগস্টের পর থেকে দেশে চলা আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির ওপর পৈশাচিক দমনপীড়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান:
- প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মামলা দিয়ে ৪ লাখের বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। তাঁর নিজের নামেও শত শত মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
- দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গিদের মুক্তি দিয়ে দেশজুড়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।
- জিডিপি প্রবৃদ্ধি তলানিতে ঠেকেছে, দারিদ্র্যের হার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
আওয়ামী লীগের সুনির্দিষ্ট দাবি এবং আন্তর্জাতিক মহলে সতর্কতা
বাংলাদেশকে বাঁচাতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন—আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার,
রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা বাতিল এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ব্যবসা-বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়বে।
জনগণের কাছে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয়
ভাষণের শেষ পর্যায়ে শেখ হাসিনা আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন গণতান্ত্রিক পথেই আওয়ামীলীগ রাজনীতিতে ফিরবে এবং দেশের মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দেবে।
তিনি জনগণের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বলেন, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস, এবং তিনি ঠিকই তাদের ভালোবাসার টানে দেশে ফিরে আসছেন।
ডিসেম্বরে তার এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোন সমীকরণ তৈরি করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
