৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যা ও থানায় হামলার দুই বছর পরও বিচার না হওয়া নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ। জানুন কেন এই বিচার রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য জরুরি।
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
প্রকাশিত: ৫ আগস্ট, ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পটপরিক্রমায় ৫ আগস্ট এমন একটি দিন, যা কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক সংঘাতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দিনটি চিহ্নিত হয়ে আছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভের ওপর চালানো এক নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত ধ্বংসযজ্ঞের কালরাত্রি হিসেবে। সেদিন সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালানো হয়েছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—বাংলাদেশ পুলিশের ওপর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল অসংখ্য থানা, পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল অজস্র দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যকে। অথচ দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান কোনো বিচার বা জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া এক গভীর জাতীয় সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
রাষ্ট্রীয় শক্তির বিনাশ ও সুপরিকল্পিত পুলিশ নিধন
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যার ওপর ন্যস্ত, সেই পুলিশ বাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে জনবিচ্ছিন্ন ও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকে সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়া। ৫ আগস্টের সেই তাণ্ডব কোনো বিচ্ছিন্ন জনরোষের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং তা ছিল সুদূরপ্রসারী এক রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। প্রথমে পুলিশকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়ে পুরো বাহিনীকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়।
থানাগুলোতে অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র লুটপাট এবং দায়িত্বরত নিরস্ত্র পুলিশ সদস্যদের নির্মমভাবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে একটি আইনশৃঙ্খলাশূন্য বা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা। যেসব সদস্য দেশের অভ্যন্তরে জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় নিজেদের জীবন বাজি রাখেন, তাঁদের যখন রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় টার্গেট করা হয়, তখন সেটি আর সাধারণ অপরাধ থাকে না, বরং তা সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের রূপ নেয়।
বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও তথাকথিত ‘রাজনৈতিক দ্বিচারিতা’
সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, পুলিশ সদস্যদের ওপর এই গণহত্যার দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। যখনই পুলিশ হত্যার বিচার চেয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখনই একটি সুবিধাবাদী মহল থেকে চর্বিতচর্বণ স্লোগান দেওয়া হয়—”আগে অন্যদের বিচার হোক।” এই ধরনের বক্তব্য কেবল একটি চরম রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা নয়, বরং বিচারব্যবস্থাকে জিম্মি করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।
ন্যায়বিচারের মৌলিক দর্শনে একটি অপরাধের বিচার আরেকটি অপরাধের মার্জনা বা বিলম্বের কারণ হতে পারে না। এক শ্রেণির হত্যাকারীদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে দায়মুক্তি দেওয়া এবং অন্য ঘটনার অজুহাতে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ফ্যাসিবাদী মানসিকতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে, এখনো অপরাধীদের পুনর্বাসন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ বাহিনীকে ভীতিগ্রস্ত করার সুদূরপ্রসারী কৌশল
আজ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পুলিশ হত্যার ন্যায়সঙ্গত দাবিকে “একপেশে” বা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।
এই কৌশলের নেপথ্যে রয়েছে একটিমাত্র সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য—বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে চিরতরে ভীতসন্ত্রস্ত, মনোবলহীন এবং নিষ্ক্রিয় করে রাখা।
যাতে আগামী দিনে দেশের যেকোনো অভ্যন্তরীণ সংকট বা অরাজকতার সময় পুলিশ আর কখনো সাহসের সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়াতে না পারে।
যখন রক্ষককেই ভক্ষক বানিয়ে কোণঠাসা করে রাখা হয়, তখন সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীকে যদি রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের শিকার বানিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে রাষ্ট্রে অরাজকতাবাদ ও মাফিয়াতন্ত্র স্থায়ী আসন গেড়ে বসে।
আজকের বাস্তবতায় এটি স্পষ্ট যে, পুলিশ হত্যার বিচারকে পাশ কাটানোর অর্থ হলো প্রকারান্তরে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের অরাজকতাকে উসকে দেওয়া।
রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষায় বিচারের অপরিহার্যতা
পুলিশ বাহিনীর ওপর চালানো এই বর্বর হামলার বিচার চাওয়া কোনো পক্ষপাতদুষ্ট বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের দাবি নয়;
এটি সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক দাবি।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি বাহিনীকে রক্ষা করতে না পারলে রাষ্ট্রের পতন অনিবার্য।
যতদিন পর্যন্ত ৫ আগস্টের এইনৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেজড়িত প্রতিটি কুশীলব ও খুনিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না যাবে,
ততদিন এই দিনটি কেবল পুলিশ বাহিনীর জন্যনয়, বরং গোটা বাঙালি জাতির জন্য লজ্জা, গ্লানি ও কলঙ্কের এককালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
