সরকারি তিতুমীর কলেজে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হাতে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় উত্তাল ক্যাম্পাস। বিশ্লেষণধর্মী এই প্রতিবেদন তুলে ধরেছে ছাত্র রাজনীতির বর্তমান হিংস্র রূপ।

সরকারি তিতুমীর কলেজ আবারও অস্থিরতায় কাঁপছে। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ছাত্র রাজনীতির হিংস্র রূপের শিকার হতে হয়েছে। ২৬ মে সকালবেলা কলেজের মূল ফটকে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হাতে সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া হামলা যেন গণতন্ত্রের ঘাড়ে বসা এক ভয়াবহ করাঘাত। বিষয়টি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতির লাগামহীন অনুশাসনেরই ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি।
সরকারি তিতুমীর কলেজের হল সিট বরাদ্দের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্যে ঘটে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদলের একটি অংশের কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ঘটে শারীরিক হামলা। আন্দোলনের দৃশ্য ধারণ করতে গেলে হামলার শিকার হন সরকারি তিতুমীর কলেজ সাংবাদিক সমিতির সদস্যরা।
ডেইলি ক্যাম্পাসের নিজস্ব প্রতিবেদক আমান উল্লাহ আলভি, সারাবাংলা ডটনেটের রাব্বি, এশিয়ান টিভির মাহমুদা আক্তার, রাইজিংবিডির উম্মে হাফসাসহ অন্তত ছয়জন সাংবাদিককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও মুছে ফেলার পাশাপাশি দেওয়া হয় হুমকি: “জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলা হবে।”
হামলায় জড়িতদের মধ্যে তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ মোল্লা, রিমু, হারুনর রশীদ, খাজা মাইনুদ্দিন, সোহাগ, সেলিম রেজা থেকে শুরু করে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রাশেদুজ্জামান হৃদয়, বাইজিদ হাসান সাকিব, আল আমিনসহ অন্তত ১২-১৫ জন নেতাকর্মী সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদের নেতৃত্বে ছাত্রদল একটি ‘আধিপত্য কায়েমের বাহিনী’তে পরিণত হয়েছে, যারা মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা ও সাধারণ ছাত্র-অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হচ্ছে কলেজ প্রশাসনের ভূমিকা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, অধ্যক্ষ ড. ছদরউদ্দিন আহমেদ তাদের ‘বিশৃঙ্খলাকারী’ বলে আখ্যা দিয়ে ছাত্রদলের হাতে তুলে দেন। একজন শিক্ষাপ্রশাসকের এ ধরনের ভূমিকায় ছাত্ররাজনীতির সন্ত্রাস যেন আরও উসকে দেওয়া হলো।
একসময় ছাত্ররাজনীতি ছিল গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যম। কিন্তু এখন তা পরিণত হয়েছে দখলদারি, লাঠিয়াল বাহিনী ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতিতে। কোনো এক দল ক্ষমতায় থাকলে তাদের ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করে, আর ‘বিরোধী’ ছাত্রসংগঠন যখন প্রশাসনের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে, তখনও ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকরাই।
তিতুমীর কলেজে ছাত্রদল এখন ‘নতুন নিয়ন্ত্রক’। আগে হল দখলে ছিল ছাত্রলীগ, এখন সেটা ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণে—এমন মন্তব্য করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এই লজ্জাজনক রূপান্তর প্রমাণ করে, সমস্যাটা দলের নয়—ছাত্ররাজনীতির অপব্যবহারই আসল সংকট।
অধ্যক্ষ বলছেন, তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও বলছেন, বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু এই ‘কমিটি গঠন’ আর ‘তদন্তের আশ্বাস’ যে কেবল সময়ক্ষেপণ ও জনরোষ ঠেকানোর ঢাল, সেটা অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই স্পষ্ট।
হামলাকারীরা কি সত্যিই শাস্তি পাবে, নাকি পেছন থেকে রাজনৈতিক সমঝোতার মোড়কে রক্ষা পাবে?
তিতুমীর কলেজের এ ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সহিংসতা নয়। এটি পুরো দেশের শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির ভয়ঙ্কর দখলদারিতার প্রতিচ্ছবি। সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে জনগণের চোখ উপড়ে ফেলা। শিক্ষার্থীকে পেটানো মানে ভবিষ্যতের কণ্ঠরোধ করা।
এখন সময় এসেছে, ছাত্ররাজনীতিকে পুনরায় মূল্যবোধ, আদর্শ ও নেতৃত্ব গঠনের পাঠশালায় পরিণত করার। নয়তো অচিরেই বাংলাদেশের প্রতিটি ক্যাম্পাস দখল হয়ে পড়বে রাজনৈতিক মাস্তানদের হাতে।
