যশোরের অভয়নগরে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে ভয়াবহ হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও গ্রেপ্তার হয়নি কেউ। ঐক্য পরিষদের ক্ষোভ ও প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।
যশোরের অভয়নগরে সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত সাম্প্রতিক হামলা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ইস্যুতে। ২২ মে বৃহস্পতিবার, বিকেল সাড়ে ৫টায় ডহর মশিয়াহাটি গ্রামে কৃষকদল নেতা তরিকুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যেভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে, তা কেবল একটি অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া নয়—বরং একটি সুসংগঠিত দমন-পীড়নের আলামত বহন করে।
তরিকুল ইসলামকে হত্যার অল্প সময়ের মধ্যেই, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে একদল দুর্বৃত্ত আশপাশের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে একযোগে হামলা চালায়।
তারা অন্তত ২০টি সংখ্যালঘু পরিবারের ঘরবাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। মহিতোষ বিশ্বাসের বাড়িতে যখন মতুয়া সম্প্রদায়ের পূজা চলছিল এবং শত শত লোক খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনও হামলাকারীরা থেমে থাকেনি।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ঘরের সমস্ত মূল্যবান জিনিস লুটে নেওয়ার পর, দুর্বৃত্তরা ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। মহিলাদের উপর চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন, পুরুষ সদস্যরা প্রাণভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। জমির দলিল, এনআইডি, সার্টিফিকেটসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ নথি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আগুন লাগানো এবং লুটপাটের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত একটি গ্রেপ্তারও হয়নি।
যদিও তরিকুল ইসলাম হত্যার মামলায় একজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তবে কল্পনা বিশ্বাসের দায়ের করা মামলায় পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা ২৭ মে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে তারা যশোর জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান। সেইসাথে তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এবং পুড়ে যাওয়া কাগজপত্র পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের প্রশ্ন— প্রশাসন কেন এখনও নীরব? হামলাকারীরা কী এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না?
বাংলাদেশে অতীতে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার পরে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তির প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। অভয়নগরের ঘটনাও যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। এখানে শুধুমাত্র হিন্দুদের ওপর হামলা নয়— এটি দেশের সংখ্যালঘু নিরাপত্তার মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
যদি প্রশাসন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
