ময়মনসিংহের সোলায়মান সেলিম জীবিত থাকলেও তাকে ‘জুলাই শহীদ’ দেখিয়ে হত্যা মামলা দায়ের। ভাইদের বিরুদ্ধে জমি সংক্রান্ত বিরোধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ।
“জীবিত থাকতে কেউ যদি আমাকে মৃত বানায়, এর চেয়ে দুঃখের আর কী হতে পারে?” — কথাগুলো বলছেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার সোলায়মান সেলিম, যার জীবনের বাস্তবতা এখন যেন কোন ট্র্যাজেডি নাটকের চিত্রনাট্য।
২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে হঠাৎ করেই তার নাম উঠে আসে একটি হত্যা মামলার এজাহারে—যেখানে বলা হয়েছে তিনি নাকি ‘জুলাই আন্দোলনে’ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। অথচ সেলিম দিব্যি বেঁচে আছেন এবং সেই মামলার এক নম্বর ‘ভিকটিম’।
সবচেয়ে ভয়ানক ও বিরল বিষয় হলো, এই মামলার বাদী তার নিজের বড় ভাই এবং সাক্ষী হিসেবে আছেন আরও দুই ভাই। সেলিম দাবি করেছেন, পারিবারিক জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকেই এই ‘মৃত্যু নাটক’ সাজানো হয়েছে, যাতে তাকে হত্যা করে মামলা বাস্তব করে তোলা যায়।
এই ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন দেশের মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। নূর খান লিটন বলেন, “এটা শহীদের মর্যাদাকে কলুষিত করার পাশাপাশি একজন নিরীহ মানুষের জীবনের ওপর হুমকি সৃষ্টি করছে।”
আইনজীবী এলিনা খান বলেন, “এ ধরনের মিথ্যা মামলা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি মামলার সত্যতা যাচাই না করে প্রক্রিয়ায় নেওয়া হলে আইনি শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।”
সেলিম এখন পর্যন্ত পাঁচবার ঢাকায় গিয়ে থানায়, আদালতে এবং গোয়েন্দা কার্যালয়ে হাজির হয়ে নিজেকে ‘জীবিত’ প্রমাণ করতে বাধ্য হয়েছেন।
অথচ যিনি জীবিত, তার জন্যও মৃত্যুর মামলা লিপিবদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রের নামধারী যন্ত্রে—এটি শুধু আইনি বিচ্যুতিই নয়, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ উদাহরণ।
জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনের পর দেড় হাজারের বেশি মামলা হয়েছে দেশে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি হত্যামামলা—যার অনেকগুলো নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মতে, এসব মামলা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো বা ব্যক্তি আক্রোশের উপকরণে পরিণত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, একটি স্বাধীন তদন্ত টাস্কফোর্স গঠনের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। কারণ, মিথ্যা মামলা শুধু নিরীহ মানুষদের হয়রানি করে না, বরং প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াকেও দুর্বল করে দেয়।
সেলিমের ঘটনায় পুলিশ এখন ডিএনএ পরীক্ষা করে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন জীবিত মানুষের ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে কেবল এটা প্রমাণ করতে যে তিনি ‘মরেননি’? এটি কি রাষ্ট্রযন্ত্রের আরেকটি ব্যর্থতা নয়?
আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে ভাইয়ের হাতে ভাই ‘মৃত’ হয়ে যায় কাগজে-কলমে, আর বিচারব্যবস্থা ব্যস্ত থাকে কেবল তদন্তের ভেতর ডুবে থাকা নিয়ে?
সোলায়মান সেলিমের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; এটি একটি বৃহৎ ও ভয়ংকর বাস্তবতার প্রতীক। যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যক্তিগত শত্রুতা আইনি প্রক্রিয়ার হাত ধরে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়, তখন বিচার, মানবাধিকার ও ন্যায়ের আশ্রয়স্থলটি হয়ে ওঠে ভয়ংকর এক বিভ্রান্তির ক্ষেত্র।
এখন সময় এসেছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সম্মিলিতভাবে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার।
কারণ, রাষ্ট্র যখন নিজেই একজন জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ বলে স্বীকার করে নেয়, তখন সে রাষ্ট্রের সজীবতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়।
