বগুড়ার শাজাহানপুরে স্বাভাবিক হৃদরোগে মৃত্যু হলেও যুবদল নেতার পরিবার তা মেনে নিলেও বিএনপি নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫৬০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। বিশ্লেষণ করছে এই রাজনৈতিক নাটকের পেছনের উদ্দেশ্য।
বগুড়ার শাজাহানপুরে যুবদল নেতা ফোরকান আলীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনার যে নাটক শুরু হয়েছে, তার সর্বশেষ দৃশ্যটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অপব্যবহারের অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা—এটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর এক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর শাজাহানপুরে একটি রাজনৈতিক মিছিলে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ফোরকান আলী হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং মারা যান।
স্বজনেরা জানান, তিনি দীর্ঘদিন হৃদরোগে ভুগছিলেন এবং এই মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক। মৃত্যুর পরে পরিবার কোনো মামলা করতে রাজি হয়নি। বরং তারা সরাসরি গণমাধ্যমে বলেন, “এটি ছিল প্রাকৃতিক মৃত্যু।”
তবে একেবারে ভিন্ন পথে হাঁটে বিএনপির স্থানীয় অংশ। প্রায় এক মাস পর, ১ নভেম্বর, ইউনিয়ন যুবদলের এক যুগ্ম আহ্বায়ক আদালতে ‘হত্যা’ মামলা করেন। মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫৬০ জনকে আসামি করা হয়।
ফোরকানের বাবা আবদুল কুদ্দুস প্রকাশ্যে আদালত ও পুলিশকে চিঠি দিয়ে লাশ উত্তোলনের বিরোধিতা করেছেন এবং মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদনও করেছেন। এমনকি গণমাধ্যমে তিনি বলেন, “আমার ছেলের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল, আমি মামলা চাই না।”
তবুও আদালত পরিবারের আবেদন খারিজ করে তদন্ত ও গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এখানেই উঠছে প্রশ্ন—এই মামলা কি ন্যায়বিচারের প্রয়াস, না কি রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার?
মামলার তদন্তে এখন পর্যন্ত ৮০ জন আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ গ্রেপ্তার করা হয়েছে উপজেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি আলাল উদ্দিনকে।
এই গ্রেপ্তার অভিযান আওয়ামী লীগপন্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের একজন নেতার স্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এমন গণগ্রেপ্তার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চিত্রকেই উসকে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরোধী দল ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে একাধিকবার সরাসরি বিচারের কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা করেছে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি।
কিন্তু একজন রাজনৈতিক কর্মীর স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রেও শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা—এটিকে কি আইনত গ্রহণযোগ্য মনে করা যায়?
এটি দেখে অনেকেই বলছেন, এ মামলার লক্ষ্য ন্যায়বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক চরিত্রহনন ও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির এক পরিকল্পিত প্রয়াস।
এই মামলার কেন্দ্রে ফোরকান আলীর মৃত্যু নয়, বরং রাজনৈতিক মাইলেজ অর্জনের এক হীন প্রয়াস রয়েছে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।
পরিবারের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে মামলা চালানো এবং শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আইনি হয়রানি—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়ানো, গণগ্রেপ্তার, আদালতের ভূমিকায় প্রশ্ন এবং পরিবারকে পাশ কাটিয়ে ‘দলের মামলা’—সব মিলিয়ে এটি যেন এক ট্র্যাজিক রাজনৈতিক কাহিনী, যেখানে মানুষ ও মানবিকতা সবচেয়ে বেশি হারিয়েছে।
