দুই লাখ মানুষ চাকরি হারালেও তার সংস্কারে কোনো কথা নেই—এই অভিযোগ এনে আন্দালিব রহমান পার্থ প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সংস্কার দর্শনের বাস্তবতাহীনতা তুলে ধরেছেন। পড়ুন বিশ্লেষণ।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি হচ্ছে “সংস্কার”। কিন্তু কার জন্য এই সংস্কার? কার সমস্যা সমাধানে? ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গণ অধিকার পরিষদ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—বরং আজকের বাংলাদেশের গভীর অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক সাহসী প্রতিচ্ছবি।
আন্দালিব রহমান পার্থ তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেন, “পলিটিকস আর ইকোনমিকস এক নয়। পলিটিকসে দুই আর দুইয়ে ২২ হয়, ইকোনমিকসে দুই আর দুইয়ে ৪ হয়।” এই বাক্যটি কৌতুকাত্মক মনে হলেও এর ভেতর লুকিয়ে আছে গভীর বাস্তবতা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে বহু প্রতিশ্রুতি থাকে, কিন্তু তা বাস্তবে কতটা রূপ নেয়—তা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে বর্তমান প্রধান উপদেষ্টার সংস্কার-ভিশন নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছে, তখন এমন পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
আন্দালিব রহমান পার্থের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—দেশে দুই লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, কিন্তু সেই বিপর্যয়ের প্রতিকারে কোনো নীতিগত সংস্কারের কথা বলা হয়নি। এ সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনের মৌলিক চাহিদার ওপর এক মরণাঘাত। অথচ সরকারপন্থী ও তত্ত্বাবধায়ক দৃষ্টিভঙ্গিতে যে “সংস্কার” শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে, সেখানে শ্রমবাজার বা চাকরি হারানো মানুষগুলোর বাস্তবতা অনুপস্থিত।
গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা এনবিআরের জুলুমে অতিষ্ঠ—এমন মন্তব্যও করেছেন পার্থ। বিষয়টি শুধুই রাজনৈতিক রণকৌশল নয়; বরং ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলের হতাশা ও ক্ষয়িষ্ণু পরিবেশের ইঙ্গিত।
ইউনূসের সংস্কার দর্শনকে যতই প্রগতিশীল হিসেবে উপস্থাপন করা হোক না কেন, তা যদি শিল্প ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তাহলে তা হবে “কাগুজে সংস্কার” মাত্র।
আন্দালিব রহমান পার্থের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংস্কার হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তিনি বলেন, “নির্বাচনই জনগণকে ক্ষমতায়িত করার একমাত্র পথ।” এখানে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছাড়া যেকোনো সংস্কার জনবিচ্ছিন্ন ও ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ১৭ বছর ধরে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তাই জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান বাস্তবিক অর্থেই এক মৌলিক রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলে, যা অর্থনৈতিক সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে
যখন একজন রাজনীতিক বলেন—”দুই লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, অথচ তার কোনো সংস্কার নেই”, তখন এটি কেবল সমালোচনা নয়, বরং একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির অভিব্যক্তি। ইউনূসের প্রস্তাবিত রাষ্ট্র সংস্কার যদি চাকরিহারা মানুষ, হতাশ ব্যবসায়ী, বা নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষকে স্পর্শ না করে, তবে সেই সংস্কার জনমুখী নয়—বরং উচ্চমুখী ও বিচ্ছিন্ন। আর তাই, আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্য আজ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে— সংস্কার কার জন্য?
