সাবেক উপাচার্য প্রফেসর কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে দুদকের মামলাকে অনেকেই দেখছেন প্রতিহিংসার রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবে। বিশ্লেষণ করলেন বর্তমান বাস্তবতায় দুর্নীতির মামলার রাজনৈতিক ব্যবহারের বিষয়টি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্নীতি এখন আর কেবল অর্থনৈতিক দুর্নীতির পরিভাষা নয়—এটি হয়ে উঠেছে এক রাজনৈতিক প্রতিশোধের কার্যকর অস্ত্র। বিশেষ করে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা বা জনপ্রশাসনের বাইরে থেকে উচ্চকণ্ঠে সমালোচনা করেন, তাদের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে দুর্নীতির মামলা যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও একসময় জাতীয় নির্বাচন কমিশন সম্পর্কিত বিতর্কিত পর্যবেক্ষণ কমিটির আলোচিত মুখ প্রফেসর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাম্প্রতিক মামলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ২০ জুন, দুদক একটি মামলা দায়ের করে যেখানে বলা হয়—কলিমউল্লাহ এবং আরও চারজন মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অনুমোদন ব্যতিরেকে নকশা পরিবর্তন করেছেন, অনুমোদন ছাড়াই কোটি টাকার চুক্তি সম্পাদন করেছেন এবং ঠিকাদারকে নিয়ম না মেনে অগ্রিম বিল দিয়েছেন। এছাড়াও নিরাপত্তা জামানতের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ও দ্বিতীয় পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদক এইসব ‘অনিয়মের’ কারণে সরকারের প্রায় ৪ কোটি টাকার ক্ষতির হিসেব তুলে ধরেছে।
এই মামলা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক দুর্নীতি নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য? এই প্রশ্নটি এখন উচ্চারিত হচ্ছে বুদ্ধিজীবী মহল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তর, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।
প্রফেসর কলিমউল্লাহ কেবল একজন সাবেক উপাচার্য নন, তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা মতপ্রকাশের জন্যও পরিচিত। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন, উপনির্বাচন ও রাজনীতির নানা পর্যবেক্ষণে তার ব্যতিক্রমী বক্তব্য এবং ‘জন-অভিমত জরিপ’ একাধিকবার ক্ষমতাসীন মহলের বিরাগভাজন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনেকের মতে, এসব ‘বিরুদ্ধমতের’ কারণেই তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকে একটি ‘signal case’ হিসেবে দেখা হচ্ছে—যেখানে উদ্দেশ্য দুর্নীতির বিচার নয় বরং ভয় দেখিয়ে চুপ করানো।
এই মামলা এমন এক সময় দায়ের হলো যখন দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে সেনসেটিভ ইস্যুগুলো ঘুরেফিরে আলোচনায় রয়েছে—গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য, ইআরপিপি বিক্ষোভ, ইউনূস-সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকরণ, এমনকি আরাকান আর্মি ইস্যু।
ঠিক তখনই একটি আলোচিত সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে মামলা জনমতকে অন্যদিকে ঘোরানোর একটি কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
একই ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেক সময় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকলে ‘দুর্নীতি’ও ক্ষমাশীল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, কারও রাজনৈতিক অবস্থান অপ্রিয় হয়ে উঠলে, পুরনো ও স্লো-মুভিং তদন্ত হঠাৎ করেই গতি পায়। প্রফেসর কলিমউল্লাহর ক্ষেত্রে কি সেই চিরাচরিত দ্বৈতনীতিরই প্রতিফলন ঘটল?
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। তবে এই লড়াই যদি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ছায়ায় না হয়, বরং একে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন কিংবা ‘নির্বাচনী ব্যবস্থা’ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়—তাহলে তা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
প্রফেসর কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা আদৌ কী কেবল প্রশাসনিক দুর্নীতির বিচার নাকি এর মধ্যে রয়েছে ভয়ংকর বার্তা—‘ভিন্নমত মানেই অপরাধ’? এ প্রশ্নের জবাব আমরা এখনই নাও পেতে পারি, তবে ইতিহাস একদিন নিশ্চয়ই জানবে, কারা মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল আর কারা সত্য বলার সাহস দেখিয়েছিল।
