তারেক জিয়ার ছায়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দিন দিন খর্বমান ভাবমূর্তি কি কেবল রাজনীতির বলি, নাকি একটি পরিকল্পিত অপমানের কৌশল? বিশ্লেষণে উঠে এলো বিএনপির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ষড়যন্ত্রের বাস্তবতা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামটি বহুদিন ধরেই একজন ‘ভদ্র’, ‘সজ্জন’ ও তুলনামূলকভাবে ‘শালীন’ রাজনীতিক হিসেবেই পরিচিত। ক্ষমতাহীন বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে বছরের পর বছর মিডিয়া ও জনসমক্ষে তিনি যতটা না দলীয় আগ্রাসন দেখিয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি নিঃস্বার্থ প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন—এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিতে এই সৌম্য রাজনীতির কোনো মূল্য আছে কি?
বিভিন্ন সময় তারেক রহমান এমনভাবে ফখরুলকে ব্যবহার করেছেন, যা দেখতে গেলে তার রাজনৈতিক ‘পঁচানি’ হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। লন্ডনে তারেক-ইনুচ (ইন্টারন্যাশনাল ন্যাশনালিস্ট ইউনিটি কাউন্সিল) গোপন বৈঠকের পর হঠাৎ করে ফখরুল ঢাকায় এসে ঘোষণা দিলেন—আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে!
প্রশ্ন হলো, কে তাঁকে এই তথ্য দিল? সরকার বলছে তারা এমন কিছু বলেনি। নির্বাচন কমিশনও বলেছে তাদের কাছে কোনো সংকেত নেই। তাহলে? ফখরুল কেন এই ঘোষণা দিলেন?
সন্দেহজনকভাবে বিষয়টি এমন সময় এসেছে, যখন বিএনপির অভ্যন্তরে নেতৃত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি তুঙ্গে। কেউ কেউ বলছেন—তারেক চান না দলের মধ্যে এমন কোনো ব্যক্তিত্ব তৈরি হোক, যাকে ভবিষ্যতে পশ্চিমা কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক মহল তার বিকল্প মনে করতে পারে।
অতীতে ‘আমান-মোজাফফর-খন্দকার মোশাররফ’ প্রজন্ম যেভাবে উঠে এসেছিল, তেমনি কিছু যেন আবার না ঘটে—সে ব্যাপারে তারেক অস্বস্তিতে।
বহু সুশীল, সাংবাদিক ও বিদেশমুখী বিশ্লেষক বরাবরই ফখরুলকে ‘মডারেট BNP’ ইমেজ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেটা যে তারেকের পছন্দ নয়, এটা বুঝে নিতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার পড়ে না।
বরং, ফখরুলকে দিয়ে বারবার ভুল বার্তা ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করিয়ে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা—এটা এখন বিএনপির ভেতরের একটা কৌশল হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।
যেমন ১২ই ফেব্রুয়ারির কথিত নির্বাচন ঘোষণা করে আবার ফখরুলকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো। অথচ দলের প্রকৃত অবস্থান বা সিদ্ধান্ত হয়তো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এতে করে মিডিয়া ও জনগণের সামনে আবারও ফখরুল ‘অভিমানী-দুর্বল-মিথ্যাবাদী’ এক করুণ চরিত্র হয়ে রইলেন।
এই প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু উত্তরটা যত দিন যাচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে—বিএনপি এখন আর গণতান্ত্রিক নয়, এক ব্যক্তি নির্ভর একনায়কতান্ত্রিক এক ছায়া সরকারে পরিণত হয়েছে। তারেক রহমান নিজেই ‘নির্বাচন চাই না’ বললে ফখরুল ‘নির্বাচনের তারিখ’ ঘোষণা করেন, আবার তারেক বললে সেটা ‘ভুল’ প্রমাণ হয়।
ফলে দলীয় সমর্থকদের ভেতর বিভ্রান্তি বাড়ে, মিডিয়ার কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা কমে, এবং সবচেয়ে ভয়ংকর—ফখরুলের মতো সজ্জন রাজনীতিক বারবার বলির পাঠা হন।
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ইতিহাস একদিন দেবে। তবে এখনকার প্রেক্ষাপটে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে—তারেক রহমান নিজ দলের দ্বিতীয় সারির নেতাদের ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দিতে চান না। বরং এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করছেন, যাতে সবাই তাঁকে নিয়েই ভাবেন, কেউ যেন বিকল্প চিন্তা না করে।
এই পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাঁচাতে পারবেন? নাকি তিনি শুধুই হবেন ‘তারেক ব্র্যান্ডেড’ বলির আরেকটি নাম?
