লালমনিরহাটে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাপ-ছেলেকে মারধরের ঘটনা উদ্বেগজনক। এই বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনটি বলছে, ধর্ম ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?
লালমনিরহাট পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ‘হানিফ পাগলার মোড়’-এ শুক্রবার (২১ জুন) দুপুরে ঘটে যাওয়া এক সহিংস ঘটনায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে স্থানীয় মুসল্লিদের একটি মব হামলা চালায় সেলুন মালিক পরেশ চন্দ্র শীল (৭০) ও তার পুত্র বিষ্ণু চন্দ্র শীল (৩৫)-এর ওপর।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, এক তরুণ মুসল্লি সেলুনে এসে ধর্মীয় আলোচনার একপর্যায়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে। অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি বাইরে গিয়ে লোক ডেকে আনেন। মুহূর্তেই উত্তেজিত জনতা সেলুন ঘিরে ফেলেন এবং পরেশ ও বিষ্ণুকে মারধর করে পুলিশের কাছে তুলে দেন।
ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান থাকা যেমন জরুরি, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা। প্রশ্ন উঠছে—শুধু এক তরুণ মুসল্লির অভিযোগের ভিত্তিতে কীভাবে আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়া যায়?
বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এক ধরনের ‘সামাজিক ফতোয়া’ এখন বিচার ব্যবস্থাকে পেছনে ফেলে ‘জনতার আদালত’ তৈরি করছে। যা রাষ্ট্রীয় শাসন কাঠামোর জন্য এক ভয়াবহ সংকেত।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৯৫ ধারায় ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ সংক্রান্ত আইন থাকলেও সেটি প্রমাণসাপেক্ষ ও আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। কিন্তু আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোনো তদন্ত, যাচাই বা প্রতিরক্ষার সুযোগ না দিয়েই জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই সমাজ কি এখন “তর্ক করলেই অপরাধী, প্রশ্ন করলেই অবমাননাকারী” এমন এক চরমপন্থায় পৌঁছেছে?
ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্নে উত্তেজনা ও হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া কেবল ভিন্নমত দমনই নয়, বরং তা ধর্মের মর্মবাণীকেও বিকৃত করে। ইসলামসহ পৃথিবীর সব মহান ধর্মেই আছে সহনশীলতা, যুক্তি ও সদাচরণের আহ্বান।
তবে আজ যদি একজন বৃদ্ধ নাগরিক চুল কাটতে আসা যুবকের কিছু প্রশ্ন করেন, আর তার ফল হয় মারধর—তাহলে কোথায় যাচ্ছে আমাদের সমাজের নৈতিক ভিত্তি? ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্নে উত্তেজনা ও হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া কেবল ভিন্নমত দমনই নয়, বরং তা ধর্মের মর্মবাণীকেও বিকৃত করে। ইসলামসহ পৃথিবীর সব মহান ধর্মেই আছে সহনশীলতা, যুক্তি ও সদাচরণের আহ্বান।
তবে আজ যদি একজন বৃদ্ধ নাগরিক চুল কাটতে আসা যুবকের কিছু প্রশ্ন করেন, আর তার ফল হয় মারধর—তাহলে কোথায় যাচ্ছে আমাদের সমাজের নৈতিক ভিত্তি?
লালমনিরহাটের পরেশ চন্দ্র শীল ও তাঁর পুত্র বিষ্ণুর ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি প্রবণতার অংশ, যেখানে বিশ্বাসের নামে বিচার পাল্টে যাচ্ছে প্রতিশোধে, আর প্রশ্নের জবাব দেওয়া হচ্ছে লাঠি দিয়ে।
রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের এখন প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান—কেননা, আজ যদি একজন বৃদ্ধ সেলুন মালিক প্রশ্নের দায়ে মার খায়, কাল সে তালিকায় যে কেউ থাকতে পারে।
