ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নঈম জাহাঙ্গীরকে আহ্বায়ক করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের এডহক কমিটি গঠন প্রশ্ন তুলেছে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে। এই পদক্ষেপ কি কেবল প্রশাসনিক, না কি এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক বার্তা?
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন আয়োজনের জন্য জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ১১ সদস্যের একটি এডহক কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে যে ব্যক্তির নাম এসেছে—নঈম জাহাঙ্গীর—তাকে ঘিরে উঠেছে নতুন বিতর্ক। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই পটভূমিতে তার নেতৃত্বে নির্বাচন অনুষ্ঠান শুধু বিতর্কিত নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক ভিত্তিকেই বিপন্ন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নঈম জাহাঙ্গীর একজন সাবেক আমলা ও কূটনীতিক। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলে তার সরব অবস্থান। যদিও তিনি দীর্ঘদিন ধরেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আসছেন, কিন্তু তার সনদের বৈধতা নিয়ে বহু আগেই জামুকায় অভিযোগ জমা পড়ে।
অভিযোগ, তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন এবং তার সনদ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব খাটিয়ে অর্জন করা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন এক সময়ে যখন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপব্যবহার করছে বলে দাবি উঠেছে, ঠিক তখনই প্রশ্নবিদ্ধ একজনকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বে বসানো একটি বিপজ্জনক বার্তা। এটি কেবল মুক্তিযুদ্ধের পবিত্রতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং দেশের রাজনৈতিক বিভাজনকেও বাড়িয়ে তোলে।
জাতীয় পর্যায়ের একজন বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধা নেতা বলেন—
“মুক্তিযুদ্ধ ছিল সত্য ও ন্যায়ের লড়াই। আজ যদি ভুয়া সনদধারীরা সেই লড়াইয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন, তবে সেটি ইতিহাসকে বিকৃত করার নামান্তর।”
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের কাজ হলো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই ও সংরক্ষণ করা। অথচ বহু অভিযোগের পরও নঈম জাহাঙ্গীরের সনদের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে, বরং তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নেতৃত্বে বসানো জামুকার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
শাহিনা খাতুন, মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে যে,
“কমিটি ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করবে এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাজ করবে।”
কিন্তু যদি কমিটির নেতৃত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কতটা থাকবে—এই প্রশ্ন আজ সামনে এসেছে।
এই ঘটনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—এটি কি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক অভিসন্ধি?
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারে কাদের প্রভাব বেশি—সেটি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। কারণ রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, সরকারের ঘনিষ্ঠরা প্রায়শই পুরস্কৃত হন, যদিও তা ন্যায়ের পরিপন্থী হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি বাঙালি জাতির গর্বের প্রতীক। আর সেই প্রতীকের নেতৃত্বে একজন বিতর্কিত, ভুয়া সনদধারী ব্যক্তি থাকলে, তা কেবল সংগঠন নয়—মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকেই অবমাননা করা হয়। সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের এখনই উচিত, এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা এবং ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার হাত থেকে রক্ষা করা।
