বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাঁচ নেতার চাঁদাবাজিতে গ্রেফতার এবং সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমার বিস্ফোরক ফেসবুক পোস্টে উঠে আসছে একটি সংগঠনের অন্তর্গত নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র। গভীরে শেকড় গাঁথা দুর্নীতির কী বার্তা দিচ্ছে এই ঘটনা?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র রাজনীতিতে নিজেদের প্রগতিশীলতা ও নৈতিক অবস্থানের দাবিদার হিসেবে পরিচিত ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ হঠাৎই শিরোনামে উঠে এসেছে চাঁদাবাজির এক গুরুতর অভিযোগে। রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির ঘটনায় সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত পাঁচজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায় সংগঠনটির সদ্য পদত্যাগী মুখপাত্র উমামা ফাতেমার ফেসবুক পোস্টে প্রকাশিত বিস্ফোরক মন্তব্যের পর।
উমামা ফাতেমা ফেসবুকে লিখেছেন—
“এই চাঁদাবাজির খবরে আশেপাশের সবাই এত অবাক হওয়ার ভান করছেন, বিষয়টা কিছুটা হাস্যকর বটে। ইশ! মানুষ কত নিঃষ্পাপ! সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো তারা আবিষ্কার করেছেন এই ছেলেগুলো আজ কিভাবে চাঁদাবাজি করল? অত্যন্ত দুঃখিত বন্ধুরা, বলতে হবে এই প্রথম কোনো চাঁদাবাজি করতে গিয়ে তারা পুলিশের হাতে ধরা খেল। ঠিকমতো খোঁজ নিলে বুঝবেন, এদের শেকড় অনেক গভীরে।”
তার বক্তব্যে স্পষ্ট—এই চক্রের দৌরাত্ম্য ছিল বহুদিনের। কিন্তু কেন এতদিন কেউ মুখ খুলেনি? আর কিভাবেই বা এমন একটি সংগঠনের ভেতর দীর্ঘদিন ধরে এমন আচরণ চলতে থাকলো নির্বিঘ্নে?
উমামা ফাতেমা তার পোস্টে আরও উল্লেখ করেছেন যে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন, রিয়াদ, গত ডিসেম্বরে তার সামনে রূপায়ন টাওয়ারে উশৃঙ্খল আচরণ করে।
এ ঘটনায় তিনি এবং তার সহকর্মীরা প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদের উপর চড়াও হয় সে।
এমনকি তার বিরুদ্ধে হুমকি, মারধর এবং চাঁদাবাজির পূর্ববর্তী অভিযোগ ছিল বলেও জানান তিনি।
এই তথ্য থেকে স্পষ্ট—চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধ সংগঠনের ছায়াতলে প্রশ্রয় পেয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মতো একটি আদর্শিক সংগঠনে যদি এমন অপরাধী চক্র অনায়াসে জায়গা করে নিতে পারে, তবে প্রশ্ন ওঠে—এই সংগঠন কতটা আদর্শিক?
উমামা ফাতেমা লেখেন,
“এই প্ল্যাটফর্মকে নষ্ট করেছে তাদের মতো লোকজন, যারা দিনশেষে সকল এক্সেস পেয়ে গেছে। দুর্নীতির কথা বললেই পিনড্রপ সাইলেন্স।”
এই বক্তব্য সরাসরি ছাত্র রাজনীতিতে আত্মীয়তাবাদ, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং আভ্যন্তরীণ অপরাধমূলক গ্যাং সংস্কৃতির প্রতি ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে নেতাদের আশেপাশে ‘প্রটোকল বাহিনী’, ‘সমন্বয়কারী’, এমনকি তথাকথিত ‘ডান হাত-বাম হাত’ থাকা একপ্রকার প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি।
উমামা তার পোস্টে এও বলেন,
“এই ছেলেগুলাকে তো নেতাদের পেছনে প্রটোকল দিতে দেখা গেছে এতদিন যাবৎ।”—অর্থাৎ এদের উপস্থিতি ছিল রাজনৈতিক-প্রশাসনিক অঙ্গনে স্বাভাবিক ঘটনা।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে—এই ধরনের নৈতিক পতন কীভাবে দীর্ঘদিন অনাকাঙ্ক্ষিত থেকে যায়?
একটি আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠন কীভাবে নিজের ভিতেই অপরাধীদের লালন-পালন করতে পারে?
সর্বোপরি, উমামা ফাতেমার মতো একজন নেত্রী কেন এতদিন মুখ বন্ধ রেখেছিলেন?
এই ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যৎ শুধু প্রশ্নবিদ্ধ নয়, সেইসাথে গোটা ছাত্র রাজনীতির সংস্কারও জরুরি হয়ে পড়েছে।
ব্যক্তির চেয়ে আদর্শ বড়—এই কথাটি বারবার বলা হলেও বাস্তবতা যেন উল্টো পথেই হাঁটছে।
উমামা ফাতেমার পোস্ট যেমন স্পষ্ট করে, ‘শেকড় অনেক গভীরে’, তেমনি এই শেকড় উপড়ে ফেলার দায়িত্বও সমাজ ও গণমাধ্যমের।
