– মাহমুদুল হাসান উৎস
ইঞ্জিনিয়ার ও অ্যাক্টিভিস্ট
বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই মাস এখন আর শুধুই একটি ক্যালেন্ডারের সময় নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক ঘটনাপুঞ্জের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই মাসকে কেবল “কোটা আন্দোলনের” পরিসরে দেখলে তা বাস্তবতার অপমান এবং ইতিহাসের সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।
এটি ছিল এক ‘সফট কুপ’-এর রূপায়ণ—যেখানে গণআন্দোলনের ছায়ায় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়, মিডিয়াকে নীরব করা হয়, এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি কাল্পনিক গণহত্যার বয়ান প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস নেয়া হয়।
মৃত্যু সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ও তথ্যবৈপরীত্য
জুলাই আন্দোলনে কতজন নিহত হয়েছেন, এ নিয়ে বিপরীতমুখী তথ্য রয়েছে। কিছু সূত্র বলছে, নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি; অন্যদিকে, OHCHR-এর তথাকথিত ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং’ রিপোর্টে বলা হয়েছে নিহতের সংখ্যা ১৪০০ জন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই রিপোর্ট ‘ফ্যাক্ট’ নাকি ‘ফিকশন’?
OHCHR নিজেই তাদের প্রতিবেদনে ‘বিশ্বাস’ শব্দটি ব্যবহার করেছে, যা কোনো ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং’ নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিবিসি বাংলা ৩০ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ২০৮ বলে উল্লেখ করে, আর শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী তা ২৬৬ জন। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকা বলছে নিহতের সংখ্যা ৮৪৩, যার মধ্যে অনেকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নন।
যশোরে একটি হোটেল লুটের ঘটনায় আগুনে মারা যাওয়া ১৯ জন, কিংবা সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের পিএস, যারা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিহত হন, তারাও শহীদ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। ফলে প্রশ্ন উঠে—এই তালিকাগুলো কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি?
গুজব, গোপন তথ্য এবং প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত
জুলাইয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজব দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। মৃত ঘোষণা করা অনেককে পরবর্তীতে জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে দেখা যায়, যা এই দাবিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তথ্য প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা ও অস্পষ্টতা আরও সন্দেহ তৈরি করে। OHCHR যদি প্রকৃত তথ্যই খুঁজে বেড়াত, তাহলে তাদের তদন্তে সেনাবাহিনী প্রধান, আইজিপি কিংবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা ছিল।
সহিংসতা ও দায়মুক্তির বিতর্ক
আশঙ্কাজনকভাবে, ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সহিংসতার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়মুক্তি ঘোষণা করে। এই ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে কারা ছিল, এবং জাতিসংঘের রিপোর্টে কেন তা উপেক্ষিত রইলো—এ প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং জাতিসংঘের নীরবতা
প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ৫–২০ আগস্টের মধ্যে ১,০৬৮টি সংখ্যালঘু স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। NSI-এর হিসাব মতে, ৩৭টি হামলায় বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনায় আক্রমণ চালানো হয়, এবং কয়েকটি ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটে।
তবুও জাতিসংঘের রিপোর্টে এসব ভয়াবহ ঘটনা গুরুত্ব পায়নি। এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে—রিপোর্টের নিরপেক্ষতা ও উদ্দেশ্য কী?
হিযবুত তাহরীরের ভূমিকা ও তথ্য উপেক্ষা
বিবিসির তথ্যমতে, হিযবুত তাহরীর আন্দোলনের সময় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। তারা প্রকাশ্যে খিলাফতের দাবিতে সমাবেশ করে এবং বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয় তৎপরতা চালায়। অথচ জাতিসংঘের রিপোর্টে এদের কোনো উল্লেখ নেই।
একটি জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণ যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে, তখন জাতিসংঘের রিপোর্টে এদের অনুপস্থিতি উদ্বেগজনক।
সাংস্কৃতিক নিধন এবং ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১,৪৯২টি ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়, যার অনেকগুলো জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন। ঢাকা শহরেই ১২২টি ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলো কেবল ইট-পাথরের নয়, বরং জাতির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক চেতনাবোধের প্রতীক।
জাতিসংঘের রিপোর্টে এই সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের কোনো উল্লেখ না থাকায় প্রশ্ন উঠছে—এটা কি নিছক অসাবধানতা, নাকি সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে?
উপসংহার
এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে আমরা শুধুই একপাক্ষিক গল্প শুনি—যা একটি জাতির ইতিহাসের সঠিক বিবরণ হতে পারে না। প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্যের প্রতি পক্ষপাত, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়া, বা অন্য পক্ষের সত্য আড়াল করাকে যদি আমরা প্রশ্ন না করি, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
আলোচনার শেষে এই প্রশ্ন থেকেই যায়—এই তথাকথিত ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং’ কি সত্যিই মানবাধিকার রক্ষার প্রয়াস, নাকি এটি একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার অংশ?
