বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতার জামায়াতবিরোধী মন্তব্য দলের অবস্থানকে কতটা প্রতিফলিত করে? ব্যারিস্টার হেলালের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে বিএনপির মেরুদণ্ডহীন অবস্থান ও জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার হেলালের একটি বক্তব্য আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তিনি জামায়াত সম্পর্কে “মুনাফেক” শব্দটি উচ্চারণ করলেও তা দলীয় অবস্থানের প্রতিফলন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় থেকে যাচ্ছে। কারণ, বিএনপি নামক দলটি যে নৈতিক, আদর্শিক ও সাংগঠনিকভাবে কতটা দুর্বল ও দিশাহীন, তা বিগত ৯ মাসের নানা অবস্থানগত ইউটার্নই প্রমাণ করে।
২০০১-২০০৬: ইতিহাস কি বিএনপিকে ক্ষমা করবে?
বিএনপি কি আদৌ জামায়াতকে মুনাফেক বলার নৈতিক অধিকার রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসের পাতায় লুকানো নয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় থেকে সংখ্যালঘুদের উপর যে নারকীয় নিপীড়ন চালিয়েছিল, তা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে। গণহত্যা, ধর্ষণ, জমি দখল, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া—এই প্রতিটি অপরাধই ঘটেছে বিএনপি ও জামায়াতের যৌথ সহায়তায়। ফলে আজ যদি বিএনপি মুখে জামায়াতকে গালি দেয়ও, তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় কারণ তাদের ‘ক্রাইম পার্টনারশিপ’ অতীতের অপরাধের চেয়ে ভয়ঙ্কর বাস্তব।
জামায়াতকে বৈধতা দিয়েছে কারা?
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত ইসলামী পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে—এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নির্দ্বিধা সত্য। অথচ সেই জামায়াতকে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। তাঁর হাত ধরেই জামায়াত আবার বাংলাদেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এরপর থেকেই বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক সম্পর্ক শুধু অব্যাহতই নয়, বরং সময়ভেদে জোট গঠন, মন্ত্রী বানানো, নির্বাচনী বোঝাপড়া সবই হয়েছে প্রকাশ্যে।
ব্যারিস্টার হেলালের বক্তব্য: আত্মস্বীকৃত মেরুদণ্ডহীনতা
ব্যারিস্টার হেলাল জামায়াতকে “মুনাফেক” বললেও দল হিসেবে বিএনপি কোনো পরিষ্কার অবস্থান নেয়নি। কারণ, দলের নীতিনির্ধারক মহলে এখনো জামায়াতপ্রীতির ছায়া বিদ্যমান। ব্যারিস্টার হেলালের মন্তব্য তাই ব্যক্তিগত পর্যায়ের বলেই ধরে নেওয়া যায়, কারণ দলীয়ভাবে বিএনপি এখনো স্পষ্ট করে জানাতে পারেনি, তারা জামায়াতকে ছাড়ছে কি না বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির ধারায় ফিরছে কি না।
বিএনপির রাজনৈতিক চারিত্রিক বিপর্যয়
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি একদিকে নির্বাচন বর্জন করছে, আবার অন্যদিকে অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখাচ্ছে। কখনো আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে, কখনো ‘ডায়লগ’-এ অংশ নিচ্ছে। এই সাংগঠনিক ভঙ্গুরতা প্রমাণ করে যে বিএনপির আদর্শ বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। তারা এখন নৈতিকতা, আদর্শ, এমনকি রাজনৈতিক বোধ থেকেও বিচ্যুত। এমন একটি দল যখন জামায়াতকে মুনাফেক বলে, তখন তা আত্মস্বীকৃত রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই বহিঃপ্রকাশ।
বিএনপি যদি সত্যিই জামায়াতকে ‘মুনাফেক’ মনে করে, তবে প্রথমে তাদের উচিত হবে নিজেদের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া। ২০০১-২০০৬ সালের অপরাধে জড়িত থাকা, জামায়াতকে পুনর্বাসন করা, এবং এখনো জামায়াতপ্রীতির চর্চা করা—এইসব কর্মই প্রমাণ করে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান কতটা নৈতিক বিচ্যুতিতে ভোগে।
ব্যারিস্টার হেলালের বক্তব্য হয়তো একক সাহসিকতা, কিন্তু দল হিসেবে বিএনপি এখনো মেরুদণ্ডহীন, বিবেকহীন এবং রাজনৈতিকভাবে দিশাহীন একটি কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়েছে।
